প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য। এক সময় মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই লালন-পালন করা হতো ধবধবে সাদা রঙের বিশেষ এক জাতের গরু। কোরবানির ঈদে রাজধানী, বিশেষ করে পুরান ঢাকার ক্রেতাদের কাছে ছিল এর ব্যাপক কদর। মাংসের স্বাদ, নরম গঠন ও তুলনামূলক কম চর্বির কারণে আলাদা পরিচিতিও তৈরি হয়েছিল জাতটির। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে গরু পালনের ধরন। সংকর ও বিদেশী জাতের বিস্তার, গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং খামারিদের পেশা পরিবর্তনের চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মিরকাদিমের ধবল গরু।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জ জেলায় বর্তমানে এ জাতের গরু রয়েছে মাত্র ২০০টির মতো। সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে ৮৪টি এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএলআরআই) রয়েছে আরো ৬১টি। সব মিলিয়ে কোনো সংকরায়ন ছাড়া মিরকাদিম জাতের গরুর সংখ্যা পাঁচশরও কম।

গায়ের রঙ ধবধবে সাদা হওয়ায় স্থানীয়ভাবে একে ‘ধবল’ বা ‘হাসা’ গরু বলা হয়। মিরকাদিম এলাকার নামানুসারে পরিচিতি পেয়েছে এটি। কেউ কেউ একে মুন্সিগঞ্জ ক্যাটেল নামেও অভিহিত করেন। প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী এ দেশীয় জাতের পূর্ণ জিনোমও উন্মোচন করেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) বিজ্ঞানীরা।

মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এমএ জলিল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরকাদিম গরু মুন্সিগঞ্জের নিজস্ব জাত। এক সময় এখানে প্রচুর পরিমাণে এ গরু পালন হতো। সবশেষ কোরবানির ঈদের সময় তথ্য সংগ্রহ করে জেলায় ষাঁড়, গাভী ও বাছুর মিলিয়ে ২০০টির মতো মিরকাদিম গরু পেয়েছি। মুন্সিগঞ্জের বাইরে এ জাতের গরু তেমন নেই। তবে নারায়ণগঞ্জে গত বছর তিন-চারটি ছিল বলে শুনেছি। বলা যায়, জাতটি এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।’

জাতটির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে খামারিদের মানসিকতা ও গরু পালনের ধরনে পরিবর্তনকে দায়ী করেন এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সংকর জাতের গরুর বিস্তার এর অন্যতম কারণ। তবে মিরকাদিমের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর হওয়ায় এর চাহিদা এখনো রয়েছে। জাতটি টিকিয়ে রাখতে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করছে। কেন্দ্রীয় গো প্রজনন খামার থেকে সংগৃহীত বীজ খামারি ও কৃষকদের সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলার ২৫ জন খামারিকে মিরকাদিম গরু পালনে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাদের সংকরায়ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মিরকাদিম গরুর বাচ্চা উৎপাদন, টিকাদানসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে। আগামী প্রাণিসম্পদ সপ্তাহেও জাতটি নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, স্থানীয় ঘাস, খড় ও শস্যজাতীয় খাদ্য দিয়েই মিরকাদিম জাতের গরু পালন করা যায়। খাদ্যের চাহিদাও তুলনামূলক কম এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে জাতটি। সাধারণ মানের খাবার ও প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। কৃমি ও অন্যান্য পরজীবীজনিত রোগ প্রতিরোধেও এর সক্ষমতা অন্যগুলোর চেয়ে বেশি।

এসব বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক বিবেচনায় পিছিয়ে পড়েছে মিরকাদিম গরু। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকর ও বিদেশী জাতের গরুর তুলনায় এর মাংস ও দুধ উৎপাদনের পরিমাণ কম। বিশেষ করে দুধ উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বাণিজ্যিক খামারিদের কাছে এ জাতের আকর্ষণ কমেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাব এবং কৃষক পর্যায়ে পালন কমে যাওয়াও তীব্র করেছে সংকটকে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মিরকাদিমের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এ গরু পালন করা হতো। এলাকার তেল ও ধান-চালের মিলে তুলনামূলক কম দামে খৈল, ভুসি, খুদ ও কুঁড়া পাওয়া যেত। এসব উপকরণ দিয়ে গরু পালন ও মোটাতাজা করা সহজ ছিল। এখন গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সে সুবিধা আর নেই। পাশাপাশি অনেক গৃহস্থ পরিবারের সদস্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন কিংবা পেশা পরিবর্তন করেছেন। ফলে পারিবারিকভাবে গরু পালনের ঐতিহ্যও ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।

মুন্সিগঞ্জের খামারি শাহীন, আমির হামজা, খালেক মিয়া ও ইমন বেপারী বলেন, খাদ্যের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় গরু পালনে আগের মতো লাভ থাকছে না। আর্থিক অনটনে অনেক খামারি পেশা পরিবর্তন করেছেন। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া ঐতিহ্যবাহী এ জাতকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন।

মিরকাদিম জাত সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামার। সেখানে বর্তমানে এ জাতের ৮৪টি গরু রয়েছে। খামারটিতে জাতটির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে গবেষণা চলছে। সংস্থাটির পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে মিরকাদিম জাতটি বিলুপ্তির পথে। এটি টিকিয়ে রাখতে ও সংখ্যা বাড়াতে আমরা গবেষণা করছি। আমাদের খামারে ৮৪টি গরু রয়েছে। মাংসের জন্য এ জাতটি বিখ্যাত। এর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়েও গবেষণা চলছে।’

কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের তথ্য অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক মিরকাদিম ষাঁড়ের ওজন ৩৫০ থেকে ৫০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। পূর্ণবয়স্ক গাভীর ওজন ২০০ থেকে ৩০০ কেজি। একটি গাভী দৈনিক গড়ে তিন থেকে পাঁচ লিটার দুধ দিয়ে থাকে। এ দুধে ফ্যাটের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্রোটিন ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ দুধ উৎপাদনের পরিমাণ কম হলেও পুষ্টিমান বেশ ভালো।

প্রজনন সক্ষমতার দিক থেকেও জাতটির কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। গাভীর প্রথম প্রজনন উপযোগী হওয়ার বয়স প্রায় ২০ থেকে ২৪ মাস। গর্ভধারণকাল গড়ে ২৭৯ দিন। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কেজি ওজনের বাছুর জন্ম নেয়। বাছুরের বেঁচে থাকার হারও প্রায় শতভাগ বলে খামারটির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মিরকাদিমের মাংসের স্বাদ, কোমলতা ও কম চর্বির বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে এটিকে ‘প্রিমিয়াম কোয়ালিটি বিফ’ হিসেবে বাজারজাত করার সুযোগ রয়েছে। সাধারণ দেশীয় খাদ্যে পালন করা যায় এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য লাভজনক হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে জাতটির বিশুদ্ধতা ও পর্যাপ্ত উৎপাদন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রুভেন বুল তৈরি শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. সফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরকাদিম দেশী জাত হওয়ায় এটি দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। ফলে এর রোগবালাই কম হয়। উৎপাদনেও সমস্যা হয় না।’

এ জাতের গরু প্রায় হারাতে বসেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশী গরুর সংখ্যা বাড়াতে কাজ করছি। কৃষক ও খামারি পর্যায়ে দেশী জাতের গরুর বীজ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। আগামী এক বছর পর বোঝা যাবে কতটা বেড়েছে। তবে এটি বাড়ছে। ধীরে ধীরে আরো বাড়বে।’

বাংলাদেশে গরুর জাত উন্নয়ন ও খামারিদের চাহিদা নিরূপণে তৈরি ‘বাংলাদেশ ডেইরি ব্রিডিং রোডম্যাপ-২০২৪’-এও মিরকাদিম জাতের বেশকিছু বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনগেন ইউনিভার্সিটি অব রিসার্চ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বিএলআরআই এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে প্রণীত এ রোডম্যাপে স্থানীয় খামারি ও সংশ্লিষ্টদের চাহিদার ভিত্তিতে গরুর জাত নির্বাচনের ১০টি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ছোট আকার, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, তাপ সহনশীলতা, খাদ্যে সাশ্রয়ী, জলবায়ু সহনশীলতা, প্রতি বছর বাচ্চা দেয়ার সক্ষমতা, দীর্ঘায়ু, দৈনিক আট লিটার দুধ উৎপাদন এবং ঈদুল আজহায় ভালো দামে বিক্রির সম্ভাবনা। রোডম্যাপ অনুযায়ী, এসব মানদণ্ডের সাতটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে মিরকাদিম জাতের।

এদিকে জাতটির বিশুদ্ধতা রক্ষায় সরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন খামারে মিরকাদিম ষাঁড়ের সিমেন (বীজ) ব্যবহার করে কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক প্রজননের মাধ্যমে জাতটির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গবেষণা চলছে। পাশাপাশি বিএলআরআইও কাজ করছে এ নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বর্তমানে মিরকাদিম গরু রয়েছে ৬১টি।

বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ড. শাকিলা ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গবেষণার জন্য আমাদের কাছে ৬১টি মিরকাদিম গরু রয়েছে। মাঠপর্যায়ে এখন অধিকাংশ গরুই সংকর হয়ে যাচ্ছে। আমরা বিশুদ্ধ মিরকাদিম জাতের গরু পেলে তা কিনে গবেষণার কাজে ব্যবহার করছি। কৃষক ও খামারি পর্যায়েও এ জাতের সিমেন সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধু মিরকাদিম জাত সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদন পাওয়া গেছে। দ্রুত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে। আশা করছি, এর মাধ্যমে জাতটির বিস্তার বাড়ানো সম্ভব হবে।’