প্রায় ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এ নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষকতা পেশায় কর্মজীবনের শুরু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। এক সময় শিক্ষকতা ছেড়ে যোগ দেন রাজনীতিতে। জেলা বিএনপির সভাপতি, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়েছেন। পাঁচ দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এ পর্যায়ে এসে ৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি। ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় তিনি বেড়ে উঠেছেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ও মা মির্জা ফাতেমা আমিন। মির্জা রুহুল আমিন ঠাকুরগাঁওয়ের সংসদ সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারে মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল।
ছাত্রজীবন থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর মির্জা ফখরুল অর্থনীতিতে অধ্যাপনা শুরু করেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতার পর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি আবার সক্রিয় রাজনীতির মাঠে ফেরেন।
১৯৮৮ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান। বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন করে মির্জা ফখরুল প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন।
তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়লাভ করেন তিনি। তবে দেশজুড়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই থেকে টানা এ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবাহিত। তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকার একটি বীমা কোম্পানিতে কর্মরত। এ দম্পতির বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ও পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।










