গতকাল এ মরমি কবির ১৪১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর হাজারীবাগে ‘কুন ক্রিয়েটিভ স্টুডিও’র আয়োজনে ‘বিচ্ছেদের বাজার: বিরহের ঐতিহ্য এবং সমকালীন বিচ্ছিন্নতার পুনর্পাঠ’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বক্তারা বলেন, উকিল মুন্সীর গান ও দর্শনে হাওরের জল-হাওয়া এবং মানুষের জীবনযাত্রা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

বক্তারা আরো বলেন, তার গানে বিরহ বা বিচ্ছেদ কেবল একটি আবেগ নয়, বরং এটি মানুষের জন্মগত এক চিরন্তন আকুতি, যা মানুষকে শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার সান্নিধ্য ও আত্মোপলব্ধির পথে নিয়ে যায়। বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার জীবনদর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে বাস্তবের সাধারণ অনুষঙ্গ থেকেই শিল্পের এক অসাধারণ জাদুকরি মহিমা বের করে আনা সম্ভব।

উকিল মুন্সীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে তার জনপ্রিয় কিছু গানের সম্মিলনে ‘বাউল গানের আসর’, আলাপ ও জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

শুরুতেই উকিল মুন্সীর বংশধরদের উপস্থিতিতে তার একটি সম্ভাব্য প্রতিকৃতিও উন্মোচন করা হয়। এরপর সেখানে গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অনার্য মুর্শিদের রচনা ও পরিচালনায় উকিল মুন্সীর জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘একতারার ইমাম’ দেখানো হয়।

স্মরণ সভায় উকিল মুন্সীর জীবন ও কর্মের ওপর বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান বক্তব্য রাখেন রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম, লোকসংস্কৃতি গবেষক ও নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া, গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী মোহম্মদ আকবর এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গবেষক অনার্য মুর্শিদ।

হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘‌স্বতন্ত্র জীবনদর্শন ও সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর হাওরে বেড়ে ওঠা অন্যতম প্রধান শিল্পী উকিল মুন্সী। তার গানে বিচ্ছেদ ও দুঃখ কেবল মনের ভেতর থাকে না, তা যেন শরীরেও অনুভূত হয়। তার ভাষায় দুঃখ গায়ের ওপর এসে ভর করে। ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্ব যেখানে সুন্দর আর কুৎসিতের দ্বন্দ্বে আটকে থাকে, উকিল মুন্সী সেখানে শরীর ও মনকে শীতল করার এক তৃতীয় মাত্রা যোগ করেন।’

সাইমন জাকারিয়া বলেন, ‘‌একটি জাতির আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি হলো তার লোকায়ত সংস্কৃতি। সে ধারায় উকিল মুন্সী কেবল একজন সাধক বা কবি নন, বরং এক বিশাল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। তার প্রকৃত পরিচয় বুঝতে গেলে আমাদের যেতে হবে এ দেশের দুই সহস্র বছর আগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা পরম্পরায়।’

উল্লেখ্য, মরমি শিল্পী রশিদ উদ্দিনের দুই প্রধান শিষ্যের একজন ছিলেন আব্দুল করিম এবং অন্যজন উকিল মুন্সী। তারা দুজনেই ছিলেন ব্যতিক্রমী শিল্পী। আব্দুল করিম যেখানে রাজনীতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, সেখানে উকিল মুন্সী ছিলেন অনেক বেশি ইহলৌকিক ও মূর্ত। তিনি পেশায় মসজিদের ইমাম হয়েও তার গানে মানুষের একদম সাধারণ ও প্রকৃত অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।