যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি নতুন মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ বা নতুন ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এজন্য ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রায় ৭১ শতাংশ এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) ঋণ নেয়া হবে। বাকি অর্থায়ন করবে সরকার।

আগামীকাল প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা তোলা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, দেশের রেলওয়েতে বর্তমানে ব্যবহৃত ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় নতুন করে ৩০টি লোকোমোটিভ কিনতে চায় রেলওয়ে। এজন্য নতুন একটি প্রকল্প সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিকল্পনা কমিশনের পাঠানো হয়। তবে বিদেশী ঋণনির্ভর প্রকল্পটিতে আগ্রহ না থাকায় তা ফেরত পাঠানো। বর্তমান সরকার রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে মিটারগেজ লাইনকে ডুয়ালগেজে রূপান্তর করার কথা থাকলেও সে উদ্যোগ পিছিয়ে যাওয়ায় ৩০টি নতুন লোকোমোটিভ কিনতে হচ্ছে। যেগুলো আগামী কয়েক দশক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে লোকোমোটিভগুলো কেনা হবে। ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে লোকোমোটিভগুলো হাতে পাওয়ার লক্ষ্য।

প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব লোকোমোটিভ কিনতে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বরাদ্দের ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা ঋণ থেকে আসবে, যা মোট বরাদ্দের ৭১ শতাংশ। বাকি ৮১১ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৮ জেলার রেলওয়েতে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে মোট ২৯৬টি লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে মিটারগেজ ১৬৮টি ও ব্রডগেজ ১২৮টি। দীর্ঘদিন ধরে পুরনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে রেলওয়ের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সক্ষমতায় সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে পণ্য পরিবহনে লোকোমোটিভ সংকটের প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থায় নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত করে বহরের সক্ষমতা বাড়াতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটি প্রায় ৭১ শতাংশ এআইআইবির ঋণ নেবে সরকার। চীনভিত্তিক এ উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পটির জন্য ঋণ দিতে সম্মতি জানিয়েছে। ফলে চীন থেকে এসব ইঞ্জিন কিনতে হবে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশাল অংকের এ ঋণ আরো বোঝা তৈরি করবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুই বছর ধরে ঋণের অর্থছাড়ের গতি শ্লথ। এমনকি নতুন প্রতিশ্রুতিও আসছে কম। কিন্তু পরিশোধ করতে হচ্ছে। সেখানে নতুন নতুন প্রকল্পে ঋণের অংক বাড়ছে। যেহেতু এটি চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ আসবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে তাদের চাহিদাও থাকবে। হয়তো তাদের থেকে কিনতে হবে।’

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই রেলওয়েতে অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য লোকোমোটিভের সংখ্যা বাড়াতে কাজ করছে সরকার। জ্বালানিসাশ্রয়ী ডিজেল-ইলেকট্রিক ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহনে সময় কমানোর পাশাপাশি আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থায়ও গতি বাড়াতে নতুন ইলেকট্রিক ইঞ্জিন কেনা হচ্ছে।

ভৌত অবকাঠামো বিভাগের রেল পরিবহন উইংয়ের যুগ্মপ্রধান গুলশান আরা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন যে ইঞ্জিনগুলো চলছে তা প্রায় ৪৫ বছরের পুরনো। ২০ বছরের আয়ুষ্কালের এসব ইঞ্জিন অনেকটা দুর্ঘটনা প্রবণ। তার পরও সংকট মোকাবেলা চলছে। নতুন রেলপথ হলেও নতুন ইঞ্জিন ছাড়াই চলছে ট্রেন। সে কারণে নতুন ইঞ্জিন কিনতে হচ্ছে। বুধবার একনেকে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হবে।’