দেশে খাবারের প্লেটে ঝুঁকির তালিকাটি প্রতিনিয়তই লম্বা হচ্ছে। গবেষণায় মুরগির মাংসে ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য এসেছে, খাবারে ধরা পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর আগেও সয়াবিন তেল, ডিমসহ নানা খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যাওয়ার খবর মিলেছে। ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারের এ বাস্তবতা শুধু অসুস্থতাই বাড়াচ্ছে না; জনগণের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং সামাজিক ক্ষতির চাপও বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এবারের স্লোগান—নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি। দেশের মানুষের খাদ্যকে নিরাপদ করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। দেশী-বিদেশী সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমদানি, রফতানি ও দেশে উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদ করা সংস্থাটির কাজ। তবে প্রতিষ্ঠার ১১ বছরেও সেই উদ্দেশ্য কার্যকরভাবে পূরণ করতে পারেনি বিএফএসএ।
২০১৫ সালে ফেব্রুয়ারিতে গঠন করা হলেও ২০২০ সাল থেকে কর্তৃপক্ষ নিজস্ব জনবল পায়। দেশের ৬৪টি জেলায় জেলা কার্যালয় এবং আটটি বিভাগীয় শহরে মেট্রোপলিটন কার্যালয় রয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৭১টি পদ রয়েছে। তবে এর মধ্যে ২০ থেকে ২২টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। বিএফএসএ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির দক্ষ জনবল নেই। যাদের নিয়ে সংস্থাটি চলছে তাদের এ বিষয়ে আগের অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে তারা কাজের মাধ্যমেই দক্ষতা অর্জন করছেন। এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজস্ব ল্যাবও নেই। ভেজালবিরোধী অভিযান চালানোর বিধান থাকলেও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অধীনে মাত্র তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট আছেন। ফলে মহানগর ও জেলা কার্যালয়গুলোর ভেজাল ও খাদ্যের মান পর্যবেক্ষণের জন্য অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইনবিধি প্রণয়ন, নজরদারি, খাদ্য ব্যবস্থা মনিটরিং, খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা, প্রশিক্ষণ, খাদ্যের মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ঝুঁকি নির্ণয় ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মতো নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংস্থাটির প্রধান দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পর্কে আইনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয়সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পরিবীক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কার্যাবলির সমন্বয় সাধন করা। সংস্থাটি বাজার, রেস্তোরাঁ, খাদ্য কারখানা ইত্যাদি পরিদর্শন করে থাকে। খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হয়, এর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, পুষ্টিমান ঠিক আছে কিনা—এসব দেখা হয়। এর মাধ্যমে কারখানাগুলোতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশনে উৎসাহিত করে থাকে। নিয়ম না মানলে সতর্ক করা হয়। এর পরও না শুধরালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটও নেই সংস্থাটির।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে সবশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরের তথ্য পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০৭০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ওই অর্থবছরে ১৬৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ১৩৬ জনকে দায়ী করে ১৩৬টি মামলা দায়ের ও ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ১১ হাজার ৭৫৪টি খাদ্য স্থাপনা (হোটেল, রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার, শিল্প, পাইকারি বাজার) পরিদর্শন করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া (অতিরিক্ত সচিব) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে একটি সমস্যা হলো কর্তৃপক্ষ নতুন। আগে দেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তেমন ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে অনেক কিছু আমাদের শিখতে হচ্ছে কাজ করার মাধ্যমে। আমরা ২০২০ সালে নিজস্ব জনবল পেয়েছি। সেজন্য মাত্র পাঁচ বছরে দক্ষতা উন্নয়ন করা সম্ভব না। দেশে নিরাপদ খাদ্যসম্পর্কিত কোনো পাঠ্যও নেই। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর দুয়েক ধরে এ বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। সারা দেশে এ বিষয়ে এক্সপার্টিজ কত আছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।’










