রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার স্থাপনের ফলে পাল্টে গেছে বান্দরবানের পিছিয়ে থাকা জনপদের চিত্র। দৃশ্যমান এ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপের কারণে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গত তিন বছরে জেলার শহুরে সুবিধার ব্যাপ্তি সম্প্রসারণ হওয়ায় গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রায় উন্নতি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, একসময় বান্দরবানের গ্রামীণ জনপদগুলো অবহেলিত ছিল। গত তিন-চার বছরে বিভিন্ন পাড়ার সড়কগুলো পাকা হয়েছে। পাড়াগুলোর বেশির ভাগ ঘরে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, কাঁচা ও অর্ধপাকা স্থাপনা ভেঙে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পাকা ভবন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণ, লাগসই পানি প্রযুক্তি, যাত্রীছাউনি, বাজার শেড, ব্রিজ-কালভার্টসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মিত হওয়ায় আধুনিক সুযোগ সুবিধা বেড়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনকালে থানচি উপজেলার দুর্গম রেমাক্রি বাজারের বাসিন্দারা জানান, সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে নির্মাণসামগ্রী এনে রেমাক্রি উচ্চ বিদ্যালয় ভবন এবং ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছে উন্নয়ন বোর্ড।

অন্যদিকে তুকতং ম্রো পাড়া, জিনিঅংপাড়াবাসী জানান, তিন বছর আগে তুকতংপাড়া ও দুই বছর আগে জিনিঅংপাড়ায় গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম স্থাপন করে দেয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ। এরপর থেকে পানির জন্য আর কোনো কষ্ট হচ্ছে না। 

সম্প্রতি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ড. শেখ মহ. রেজাউল ইসলাম বলেন, ২১৭ কোটি টাকার সোলার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য এলাকার গ্রামীণ জনপদে এসব সোলার স্থাপন কার্যক্রম শিগগিরই শেষ করা হবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বান্দরবান নির্বাহী প্রকৌশলী এনএসএম জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, গত তিন বছরে আটটি প্রকল্পের আওতায় ৩৪৯ স্কিমে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পগুলোর আওতায় আরো এক হাজারের বেশি কিলোমিটার সড়কের কাজ চলমান রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন মো. ইয়াসির আরাফাত বণিক বার্তাকে বলেন, গত তিন বছরে জেলার আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ও থানচি উপজেলার দুর্গম রেমাক্রিসহ নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়িতে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঘুমধুমে উচ্চ বিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে। রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি কলেজ ভবন, লামা মাতামুহুরী কলেজ অডিটরিয়াম নির্মাণ, কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সম্প্রসারণের কাজ সম্পন্নসহ বান্দরবান সরকারি কলেজের অডিটরিয়াম নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া বান্দরবান সরকারি মহিলা কলেজ, বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ প্রাথমিক, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে জেলায় ৪০টি ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে হাজি এমএ ডিগ্রি কলেজের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া গত তিন বছরে ৫৩ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ইট বিছানো পাকা সড়ক এবং ছয়টি ব্রিজ ও ২২টি কালভার্ট করা হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বান্দরবান পৌরসভার মেয়র মো. ইসলাম বেবী বণিক বার্তাকে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২১টি বিশেষ অঙ্গীকারের মধ্যে একটি হলো, আমার গ্রাম আমার শহর। এ অঙ্গীকার পূরণে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এ উদ্যোগ নিয়েছেন।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার কারণেই পাহাড়ে আধুনিক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। কোন ক্ষেত্রে কীভাবে কী কাজ করলে পর্যটন নগরী বান্দরবানের গ্রামীণ জনপদ আরো উন্নত হবে, এ লক্ষ্যে সার্বিক বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে চলেছে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এনডিসি বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রামীণ জনপদে শহুরে সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতে ১৮-২০টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ ও পরিকল্পনা পরিষদের অনুমোদিত এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড।