উৎপাদন ও দাম ভালো পাওয়ায় দিনাজপুরের হিলিতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সরিষার আবাদ। একইভাবে এ উপজেলায় বাড়ছে আলুর আবাদ। আমন ধান কাটার পর কৃষক ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরিষা ও আলু চাষাবাদে। কিন্তু অন্যান্য সার পরিমাণে কম মিললেও পটাশ সার একেবারেই মিলছে না। এতে সরিষা ও আলু চাষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষীরা। সারের অভাবে আলুবীজ বপনে বিলম্ব হওয়ায় ফলন কম হওয়াসহ দাম না পাওয়ার আশঙ্কা চাষীদের। তবে পটাশসহ কোনো সারের সংকট নেই বলে দাবি করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
হিলিতে সার নিতে আসা কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমন ও বোরো আবাদের মাঝের সময়টা জমি পড়েই থাকে। তাই এসব জমি ফেলে না রেখে তিন ফসল চাষাবাদের উদ্যোগ নিয়েছি। ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার কারণে সরিষার দাম যেমন ভালো পাওয়া যাবে, তেমনি বাড়ির চাহিদা পূরণে এবার ১০ বিঘা জমিতে সরিষার চাষাবাদ করেছি। কিন্তু সেই জমিতে সার দিতে না পারায় সরিষার ফলন তো আমাদের কমে যাবে। সার কিনতে গিয়ে ঘুরে আসতে হচ্ছে। ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। আজ নয় কাল দেবে এভাবে শুধু আমাদের ঘোরাচ্ছেন দোকানিরা। আর তারা যে পরিমাণ সার দিচ্ছেন তাতে ফসলের ঠিকমতো ফলন হবে না। আমরা যেখানে তিন বস্তা সার দিই, সেখানে এখন সার দিচ্ছে ১০-১৫ কেজি করে। এ সার দিয়ে তো আমাদের আবাদ সম্ভব নয়।’
কৃষক আইনুল হোসেন বলেন, ‘স্লিপের মাধ্যমে সার নিতে গিয়েও পাচ্ছি না। ডিলারের কাছে সার না পেয়ে বাড়তি দাম দিয়ে খোলাবাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। সারের দাম বস্তাপ্রতি কয়েকশ’
টাকা করে বাড়তি দিতে হচ্ছে। যে কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে আমরা কীভাবে আলু চাষ করব।’
কৃষক রুহুল আমিন বলেন, ‘আট বিঘা জমির ধান কাটার পর তিন বিঘায় সরিষা ও পাঁচ বিঘা জমিতে আলুবীজ বপন করব। সেজন্য সব প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু পাঁচদিন ধরে সার আনতে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে, সার পাইনি। পাঁচদিন পরে গিয়ে ১০ কেজি করে পটাশ ও ১০ কেজি করে ডিএপি, পাঁচ কেজি করে ইউরিয়া সার দিচ্ছে। যেখানে আমার জমিতে সার প্রয়োজন পাঁচ বস্তা সেখানে যে পরিমাণ সার দিচ্ছে তাতে ঠিকমতো আবাদ করতেও পারছি না। ডিলাররা সার রেখেও দিচ্ছে না। ফলে আলু ও সরিষা আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। আমরা যদি আগাম আলু ও সরিষা লাগাতে না পারি তাহলে তো ফলন কম হবে, আবার ঠিকমতো দাম পাব না।’
কৃষক তাহাজুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষি অফিস থেকে স্লিপ করে নিয়ে ডিলারের দোকানে সার নিতে এসেছি। ইউরিয়া, পটাশ ও ড্যাপ সার পাওয়ার কথা। দোকানে ইউরিয়া ও ডিএপি সার আছে কিন্তু পটাশ নেই। জমি প্রস্তুত করে রেখেছি। সারের অভাবে সরিষা লাগাতে পারছি না।’
হিলি বাজারের সারের ডিলারের ম্যানেজার ইমরান আলী বলেন, ডিএপি বা ইউরিয়া সার প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। এসব সারের কোনো সমস্যা নেই। কৃষক সার পাবেন। শুধু পটাশ সারের একটু সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট বলতে ঘাটে সার নিতে ট্রাক গিয়ে তিন-চারদিন হলো দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে কী যেন সমস্যা, যে কারণে কোনো সার লোড হয়নি। এ কারণে সারের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এছাড়া যে কৃষকের সার লাগবে ২৫ কেজি, সেখানে নিয়ে যাচ্ছেন ৫০ কেজি। কারো লাগবে হয়তো এক বস্তা, তিনি নিয়ে যাচ্ছেন তিন বস্তা। যার কারণে পটাশ সারের সংকট দেখা দিয়েছে। ঘাটে ট্রাক লোড হয়ে গেলে দু-এক দিনের মধ্যে পটাশ চলে আসবে। তখন আর কোনো সমস্যা থাকবে না। আমরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে পটাশ ৭৫০ টাকা, ডিএপি ৮০০, টিএসপি ১ হাজার ১০০ ও ইউরিয়া সার ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছি। এর বাইরে কোনো বাড়তি টাকা নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া সার তো বিক্রি করা হচ্ছে কৃষি অফিসের স্লিপের মাধ্যমে।’
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মমতাজ সুলতানা বলেন, ‘আমরা জোরালোভাবে সারের বিষয়টি মনিটর করছি। প্রত্যেক কৃষককে তার জমির পরচা ও কৃষি কার্ডে জমির পরিমাণ নিশ্চিত হয়ে স্লিপের মাধ্যমে সার দেয়া হচ্ছে। ফলে যতটুকু সার প্রয়োজন এ উপজেলার কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যে সে পরিমাণ সার পাচ্ছেন। এ উপজেলায় কোনো সারের সংকট নেই। আমাদের যে পরিমাণ বরাদ্দ আসে তার ওপর নির্ভর করে আবাদি জমির পরিমাণ হিসাব করে কৃষকের সংখ্যা নির্ধারণপূর্বক স্লিপের মাধ্যমে সার দেয়া হচ্ছে। পটাশ সারের কোনো সংকট নেই।’
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নূরজ্জামান বলেন, ‘প্রতি বছর চাহিদার তুলনায় আলুর বাড়তি উৎপাদন হওয়ার কারণে কৃষকের দাম পাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। ফলে চলতি মৌসুমে দিনাজপুর জেলায় কিছুটা কমিয়ে ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩১ হাজার হেক্টর জমিতে আলুবীজ বপন করা হয়েছে। গত বছর জেলায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছিল। বর্তমানে মাঠের যে অবস্থা তাতে এবার আলু চাষ কিছুটা কমবে। এ বছর ২০ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আশা করছি আরো অন্তত সাত হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হবে।’










