ছোট্ট একটি টিনের ঘর। সেখানে চলছে দুপুরের রান্নার আয়োজন। একটু এগোতেই সারি সারি রিকশা, আর মাথার সমান উচ্চতায় ঝুলছে ব্যাটারি চার্জ দেয়ার বৈদ্যুতিক সংযোগ। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন। দেয়াল ঘেঁষে টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে চালকদের থাকার জায়গা; ওপরে ঝুলছে পোশাক। দিন-রাতে বিভিন্ন শিফটে এভাবেই গ্যারেজে থাকছেন রাজধানীর হাজার হাজার রিকশাচালক। এতে বড় ধরনের অগ্নিকণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা যেকোনো সময় প্রাণহানির মতো দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

ঢাকায় অনেক আবাসিক এলাকার ভেতরেই গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এমন গ্যারেজ। রিকশা রাখা এবং ব্যাটারি চার্জ দেয়া হয় টিন-বাঁশের তৈরি এসব অস্থায়ী স্থাপনায়। কাঠামোগতভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা এসব গ্যারেজে একই সঙ্গে চলে চালকদের রাতযাপন, রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়া। এভাবে রিকশা গ্যারেজে বৈধ-অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নার আগুন ও মানুষের বসবাসে তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি অপরাধ বিভাগের আটটিতে রয়েছে সহস্রাধিক গ্যারেজ। বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার এবং অর্ধলক্ষাধিক অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট। প্রায় সব গ্যারেজেই রয়েছে ব্যাটারি চার্জ দেয়ার ব্যবস্থা।

প্রতিদিনই ঢাকার রাস্তায় নামছে কয়েকশ নতুন ব্যাটারিচালিত রিকশা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর, কেরানীগঞ্জ, কমলাপুর, সবুজবাগ, মান্ডা, গাজীপুর ও টঙ্গীতে অবস্থিত অন্তত এক হাজার কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব রিকশা। রিকশার সঙ্গে বাড়ছে গ্যারেজ ও চার্জিং অবকাঠামোর চাহিদাও। কিন্তু সেই অবকাঠামো কতটা নিরাপদ ও পরিকল্পিত, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার একটি রিকশা গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রবেশপথটি সরু। বাইরের ধূলিধূসর রাস্তা ও আবর্জনা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় বাঁশ-কাঠের খুঁটি ও টিনের চাল দিয়ে তৈরি আধাপাকা কাঠামো। এখানে রাখা হয় প্রায় ৪০টি রিকশা। গ্যারেজের পাশেই টিন দিয়ে তৈরি ঘরে চলছে রান্না। একই জায়গায় আবাসন, সারি সারি রিকশা, রান্নার আগুন, অনেকগুলো বৈদ্যুতিক সংযোগ—সব মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি খালি চোখেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক চালক গাদাগাদি করে এসব গ্যারেজে বিশ্রাম নেন ও রাতে ঘুমান। ফলে গ্যারেজগুলোর অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্যারেজের মালিক মোহাম্মদ রমজান আলীর পরিবার প্রায় চার দশক ধরে রিকশার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তার গ্যারেজে ৩৮টি রিকশা রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে রমজান আলীর নিজের ১৬টি রিকশা রয়েছে বলে জানান তিনি। বাকিগুলো অন্য মালিকদের।

গ্যারেজে বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়ে ঝুঁকির বিষয়টি মানতে নারাজ গ্যারেজ মালিকরা। ঢাকার বেশ কয়েকটি গ্যারেজ ঘুরে এ বিষয়ে মালিকদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। তাদের দাবি, রিকশা চার্জ দেয়ার জন্য সরাসরি কোনো সংযোগ বা ‘ডাইরেক্ট লাইন’ ব্যবহার করা হয় না। কাটআউট ও সেফটি মিটারের মাধ্যমে চার্জিং লাইন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চার্জিং লাইনে কোনো ধরনের বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা শর্ট সার্কিট হলে মূল সংযোগের সকেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে না বলে দাবি তাদের।

তবে একই স্থানে রান্নার আগুন, বৈদ্যুতিক ব্যাটারি চার্জিং এবং চালকদের থাকার ব্যবস্থা কোনোভাবেই নিরাপদ নয় বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়। তাই সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এসব গ্যারেজ কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত ও যাচাই-বাছাই ছাড়া ঢালাও অনুমোদন দিলে যেকোনো সময় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে।’

অনুমোদনহীন গ্যারেজে রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে চার্জ দেয়ায় সরকার বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কেউ যদি অনিয়মের মাধ্যমে এসব অবৈধ কার্যক্রমের সুযোগ করে দেয়, তাদেরও দ্রুত জবাবদিহি ও আইনের আওতায় আনা উচিত।’

রিকশা গ্যারেজে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলাকাভিত্তিক পরিদর্শনের সময় আবাসিক ভবনের বৈদ্যুতিক স্থাপনাসহ সব ধরনের স্থাপনা পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনে কোনো ত্রুটি বা ঝুঁকি শনাক্ত হলে তা নিরসনে ভবন মালিককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।’