ফুলে-ফলে ভরা লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ তরমুজ খেতে এখন সবুজের সমারহ। এ তরমুজ খেতে ‘গেমি স্টেম লাইট’ রোগের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষীরা। এক রাতের ব্যবধানে সুস্থ-সবল গাছ পাতা ও কাণ্ড শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। ফলে আবাদকৃত ফসল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ রোগ থেকে তরমুজ গাছ বাঁচাতে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের শরণাপন্ন হয়েও সুফল পাচ্ছেন না চাষীরা। এতে এ খাতে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন লোকসানের আশঙ্কায় ও ঋণের বোঝা নিয়ে দুশ্চিন্তায় অনেকেই।
খবর শুনে খেত পরিদর্শনে গিয়ে তরমুজ গাছে ‘গেমি স্টেম লাইট বা কাণ্ড ঝলসানো, ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া’জনিত রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. জাকির হোসেন। চাষীদের হতাশ না হয়ে নিয়মিত বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণত রোগটি শসা ও ক্ষীরা জাতীয় ফসলে দেখা যায়। তরমুজ খেতে ‘গেমি স্টেম লাইট বা কাণ্ড ঝলসানো, ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া’জনিত রোগ দেখা দিলে ‘ম্যানকোজেব’ বা ‘মেটালেক্সিল’ গ্রুপের যেকোনো ছত্রাকনাশক (যেমন টেলিনর) পানিতে মিশিয়ে তিনদিন সব তরমুজ গাছের গোড়া ভিজিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। অতিরিক্ত আক্রান্ত হলে দুই লিটার পানিতে এক কেজি চুন ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে তরমুজ খেতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছর জেলার পাঁচ উপজেলার ১৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪ হেক্টর, রায়পুরে ৪০ হেক্টর, রামগঞ্জে ১ হেক্টর, রামগতিতে ১১০ হেক্টর ও কমলনগরে ২৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এ বছর তরমুজের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৩০ হেক্টর।
জেলা কৃষি বিভাগের তৈরি করা এ তথ্যে গরমিল রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় তরমুজচাষীদের। আলাপকালে তারা জানান, লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্মীপুর সদর ও রামগতি উপজেলাই এ চাষ বেশি হয়ে থাকে। এর মধ্যে শুধু সদর উপজেলা কুশাখালী ইউনিয়নের নলডগি, চর মটুয়া, পুকুরদিয়াসহ আশপাশ এলাকার প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে।
অনুকূল পরিবেশ ও ভালো ফলন এবং দাম পাওয়ায় দিন দিন তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এখানকার কৃষক। তাই বছর বছর বেড়েই চলেছে এ অঞ্চলে তরমুজের চাষ। ‘গেমি স্টেম লাইট বা কাণ্ড ঝলসানো ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া’জনিত রোগের আক্রমণে হঠাৎ করে খেতে ফলনসহ তরমুজ গাছ মারা যাচ্ছে। এতে ফলন বিপর্যয়ে লোকসানের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে সবুজ তরমুজ গাছ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। চারা গাছগুলো আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে ফুল ফল ধরতে শুরু করেছে। এতে ভালো ফলনের আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন জেলার তরমুজচাষীরা। কিন্তু হঠাৎ করে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে তরমুজের খেতে দেখা দিয়েছে গেমি স্টেম লাইট বা কাণ্ড ঝলসানো, ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। এতে ফুলে ফলে ভরা গাছগুলো দেখা যায় সকালে ভালো তো বিকালে হঠাৎ করে মরে যাচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও গাছ সবল থাকলেও নেই ফলন। ফলে কৃষক দিশেহারা হয়ে স্থানীয় কৃষি বিভাগ, বীজ ও বালাইনাশক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। কিন্তু কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কিছু পরামর্শ পেলেও বীজ ও বালাইনাশক কোম্পানিগুলোর উদাসীনতায় হতাশ চাষীরা।
এদিকে স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েও কোনো কার্যকর ফল না পাওয়ায় ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় এখন দিশেহারা চাষীরা। এ পরিস্থিতিতে লাভের আশা বাদ দিয়েছেন তারা। চাষের খরচ তুলে আনতে পারবেন কিনা এমন চিন্তায় কাটছে তাদের দিন। তাই দ্রুত এ বিপর্যয় থেকে মুক্তি না পেলে লাখ লাখ টাকার ঋণ নিয়ে তরমুজ
খেতে ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন অধিকাংশ চাষী।
কুশাখালী ইউনিয়নের তরমুজচাষী মানিক মিয়া জানান, ১০ বছর ধরে ১২ একর জমিতে তরমুজের চাষ করে আসছেন। একেকটি চারা রোপণেই ১৫০/২০০ টাকা খরচ হয়। এবারের মতো পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েননি। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তরমুজের চাষ করে থাকেন, পরে উৎপাদিত তরমুজ বাজারে বিক্রি করে প্রতি বছর ওই ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু এবার তরমুজ খেতের অবস্থা দেখে ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
একই কথা বললেন চাষী আবুল কাশেম, হুসাইন আলী ও মো. রিয়াজ, শুধু নলডগি এলাকায়ই প্রায় ২০০ একর জমিতে তরমুজ চাষ হয়। সুপ্রিম সিড কোম্পানির গ্লোরি, জাম্মু, সুপ্রিম সুগার, ওরিয়ন জাতের তরমুজ বীজ চাষ করে আসছি। এমন রোগ আগে কখনো দেখিনি। কৃষি কর্মকর্তা ও কোম্পানীর লোকদের পরামর্শ অনুযায়ী সোলোভোরন, থ্রি-ভিট, সালবার, দস্তাসহ বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এখানকার বেশির ভাগ চাষী ঋণগ্রস্ত। তাদের এ লোকসান পুষিয়ে নিতে সরকারি সহায়তা চেয়েছেন তারা।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, গেমি স্টেম লাইট বা কাণ্ড ঝলসানো রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে পরামর্শ অনুযায়ী কৃষক খেতে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করেও সুফল পাচ্ছেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তরমুজ চাষে চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার ও কৃষি বিভাগ তাদের পাশে থেকে সহায়তা করবে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হবে।










