সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলজুড়ে টানা বৃষ্টিপাত, জলোচ্ছ্বাসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্লাবিত হয়েছে নদ-নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। এছাড়া কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শেষাংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে দেয়া জিও ব্যাগ ফুটো হয়ে ক্রমেই বিলীন হচ্ছে।

জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়াসহ উপকূলীয় বেশ কয়েকটি দ্বীপের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া টানা বৃষ্টিপাতে বান্দরবানে পাহাড় ধসের পাশাপাশি রুমা উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিম্নচাপটি লঘুচাপে পরিণত হলেও থেমে থেমে বাতাসের তীব্র গতি ও ভারি বর্ষণে মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, নিম্নচাপের প্রভাবে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৬৭ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবার বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা থেকে গতকাল ৩টা পর্যন্ত ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নিম্নচাপটি লঘুচাপে পরিণত হয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের দিকে চলে যায়। এর প্রভাব বিদ্যমান থাকায় আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় বিপৎসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিম্নচাপটি লঘুচাপে পরিণত হয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল দিয়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হয়েছে। নিম্নচাপের কারণে চট্টগ্রামসহ উপকূলজুড়ে দমকা হাওয়া ও ভারি থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ সময় মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আরো কয়েকদিন বৃষ্টিপাতের পর আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে।’

এদিকে সমুদ্র উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। তলিয়ে গেছে নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপের বেশির ভাগ অঞ্চল। হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বিরূপ আবহাওয়ায় সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোর বেশির ভাগ এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ঝড়ো হাওয়া ও সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চারটি নৌযান চট্টগ্রামের উপকূলের তীরে উঠে গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা ও আনোয়ারা উপজেলার উপকূলে এসব নৌযান আটকা পড়ে।

সমুদ্র উপকূলীয় চট্টগ্রাম শহরে জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলেও বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের জলাবদ্ধতাকে প্রাধান্য দিয়ে অধিকাংশ খাল ও নালা পরিষ্কার করা হয়েছে। এ কারণে ভারি বর্ষণেও দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনের চলমান প্রকল্পের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দ্রুত সময়ে শেষ করার পাশাপাশি প্রাধান্য দিয়ে নির্মীয়মাণ ড্রেনেজ সিস্টেমকে পানি নিষ্কাশনের উপযোগী করে রাখায় ভারি বৃষ্টিপাতেও চট্টগ্রাম নগরী অতটা জলমগ্ন হয়নি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার আমরা সবগুলো সংস্থাই সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি ইউনিট আকারে কাজ করেছি। বর্ষা মৌসুম শুরুর দিকে কয়েকটি টানা বৃষ্টিপাতের পর জলাবদ্ধতাসংক্রান্ত বিষয়ে রিভিউ করা হয়েছে। এরপর প্রকল্পের আওতায় থাকা খালগুলো পরিষ্কার করা, মনিটরিং সেল তৈরি করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যার সুফল হিসেবে গত দুইদিনের টানা বর্ষণেও চট্টগ্রামে বড় কোনো জলাবদ্ধতা হয়নি।’

টানা বর্ষণে খুলনার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতকাল ভোরে হরিণখোলা গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাঁধের ১৩-১৪/২ নম্বর পোল্ডারের পাঁচটি স্থানের ৩০০ মিটার নদে ধসে পড়ে। এতে হুমকিতে পড়েছে বাঁধসংলগ্ন হরিণখোলা, ২ নম্বর কয়রা, গোবরা, ঘাটাখালী, মদিনাবাদ গ্রামসহ কয়রা উপজেলা সদরের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ।

খুলনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, বৃহস্পতিবার থেকে নিম্নচাপের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে জোয়ারের উচ্চতা ছিল বেশি। কয়রা উপজেলার হরিণখোলা এলাকার বেড়িবাঁধে ধস ও চৌকুনি এলাকায় কয়রা নদীর বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছিল। তাৎক্ষণিক ভাঙনকবলিত স্থানে পাউবোর প্রকৌশলীরা পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন যাতে আর না বাড়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সাগর উত্তাল থাকায় নোয়াখালীর হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপসহ উপকূলীয় চরাঞ্চলে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। নিম্নচাপের কারণে বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবার দুপুরে দুই দফায় পানি প্রবেশ করায় এসব এলাকার বাড়িঘর পানিতে ডুবে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে বৃহস্পতিবার রাতে হাতিয়ার মেঘনা নদীর মোহনায় পণ্য বোঝাই একটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে।

জোয়ারের পানি ৪-৫ ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হয়ে কক্সবাজারে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারপাশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। এছাড়া জোয়ারের আঘাতে ঘাটে নোঙরে থাকা অন্তত পাঁচটি মাছ ধরার ট্রলার বিধ্বস্ত হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বীপের গলাচিপা, কোনাপাড়া, দক্ষিণপাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্তত অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে চারদিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে দ্বীপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জোয়ারের পানি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। ঘাটে নোঙর করে থাকা মাছ ধরার ট্রলার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়েছি। তবে আতঙ্কের কিছু নেই, সেন্ট মার্টিনের জনপ্রতিনিধিরা সবাই একযোগে কাজ করছেন। কোনো ধরনের সমস্যা হলে লোকজন সরিয়ে এনে আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হবে। এখনো লোকজনকে সরিয়ে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

টানা বৃষ্টিপাতে পার্বত্য বান্দরবান জেলায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে রুমা উপজেলার সঙ্গে বান্দরবান সদরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গতকাল দুপুর থেকে ওয়াইজংশন-রুমা সড়কের একটি অংশে পাহাড় ধসে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড় ধসের আশঙ্কায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা শহর ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বাসিন্দাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

বান্দরবান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আসিফ রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। পাহাড় ধস ও নিম্নাঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ির বাসিন্দাদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’

ভোলায় অস্বাভাবিকভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরফ্যাশন, মনপুরা ও তজুমদ্দিন উপজেলায় পাঁচ সহস্রাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে সহস্রাধিক গবাদিপশু। চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় এখনো তিন থেকে চার হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এছাড়া লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলার দুই স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। জোয়ারের পানিতে ২৩৪টি ঘের ও ২ হাজার ৫৩৩টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

ভোলার জেলা প্রশাসক আজাদ জাহান বলেন, ‘নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫ হাজার ২০০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০৮টি ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চাল ও শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন।’

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে অনির্দিষ্টকালের সব ধরনের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ জানান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।