কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে রফতানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান গ্রুপের। গার্মেন্টস খাতের নানা সংকটের সময়ও কর্মীদের বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানে এগিয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে নভেল করোনাভাইরাস সংকটে কারখানা কয়েক দফায় বন্ধ রাখার কারণে বেতন-ভাতা নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়েছে স্বনামধন্য এ প্রতিষ্ঠানেও। সর্বশেষ এপ্রিলের বেতন-ভাতা অর্জিত ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রদান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর কয়েক দফায় বন্ধ রাখা হয় চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (সিইপিজেড) ও কোরিয়ান ইপিজেডের কর্ণফুলী সুজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সর্বশেষ এপ্রিলের ২৬ তারিখ থেকে ইয়াংওয়ান গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানই খুলে দেয়া হয়। যদিও সীমিত পরিসরে বন্ধের মধ্যেও ইয়াংওয়ানের বিভিন্ন ইউনিটের শ্রমিকরা কাজ করেছেন। কারখানা খোলার পর ১০ মে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিকের এ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা দেয়া হয়। বেতন প্রদানের আগে কর্মীদের দেয়া পে-স্লিপে নৈমিত্তিক ছুটি ও অর্জিত ছুটি থেকে সাধারণ বন্ধ চলাকালীন ১২ দিন কেটে সমন্বয় করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এ পদ্ধতিতে বেতন-ভাতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানালেও বেতন পাওয়ার পর শ্রমিক-কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে ইয়াংওয়ান গ্রুপ ও ইপিজেড কর্তৃপক্ষ। ইয়াংওয়ান গ্রুপ বলছে, শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নৈমিত্তিক ও অর্জিত ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে শতভাগ বেতন দেয়া হয়েছে। বেতন দেয়ার আগে ইপিজেড কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তাদের অনুমতিও নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইয়াংওয়ান। যদিও ইপিজেড কর্তৃপক্ষ বলছে, শ্রমিকদের ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে বেতন-ভাতা দেয়ার বিষয়টি তাদের জানা নেই।

ইয়াংওয়ান সিইপিজেডের ১৩টি ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক মো. হারুনুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, এপ্রিলের অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা কারখানার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ বেতন দেয়ার ক্ষমতা রাখে কারখানা কর্তৃপক্ষ। আমরা বিষয়টি নিয়ে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা বেতন কর্তনের পরিবর্তে ছুটি সমন্বয়ের দিকেই মতামত দিয়েছে। তাছাড়া বেতন-ভাতা প্রদানের আগে বেপজা থেকে অনুমতিও নেয়া হয়েছে। ফলে ইয়াংওয়ানের বেতন-ভাতা প্রদান নিয়ে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই। এখন কোনো শ্রমিক বিষয়টি না মানলে কর্তৃপক্ষের কিছুই করার নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. খুরশিদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের চলমান সংকটে আমরা গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কারখানার বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করছি। ১১ মে পর্যন্ত সিইপিজেডের ৯০টি কারখানা বেতন-ভাতা দিয়েছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইয়ংওয়ান গ্রুপ শ্রমিকদের ছুটি সমন্বয় করে বেতন-ভাতা দেবে, এটা আমাদের জানা ছিল না। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে বা লিখিত চিঠি পেলে আমরা বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখব।

আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেডে ইয়ংওয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী সুজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে কাজ করেন ৩০ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী। এছাড়া সিইপিজেডের তিনটি সেক্টরে সব মিলিয়ে ১৩টি ইউনিটে কাজ করেন ৪০ হাজার শ্রমিক। কোরিয়ান ইপিজেডের কারখানাটিতে জুতা উৎপাদন করলেও সিইপিজেডের কারখানায় রফতানিযোগ্য পোশাক তৈরি করা হয়। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে গত ১ এপ্রিল থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত তিনদিন (একদিন সাপ্তাহিক ছুটি) বন্ধ ছিল। এরপর ৬ এপ্রিল থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি নির্দেশে কারখানা বন্ধ ছিল। কিন্তু এরপর গার্মেন্টস ও রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা খোলা রাখার বিষয়ে সরকারি শিথিলতা থাকলেও ইয়ংওয়ান গ্রুপের কারখানাগুলো চালু করেনি কর্তৃপক্ষ। তবে ১৫ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত (সাপ্তাহিক ছুটি ব্যতীত) ১২ দিন প্রতিষ্ঠানটি নিজ উদ্যোগে কারখানা বন্ধ রাখে। কিন্তু কারখানা বন্ধ রাখার পরও শ্রমিকদের নৈমিত্তিক ছুটি ও অর্জিত ছুটি থেকে ১২ দিন কেটে বেতন-ভাতার সঙ্গে সমন্বয় করে বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইয়ংওয়ান গ্রুপের কর্ণফুলী সুজ ও ইয়ংওয়ান লিমিটেডের একাধিক কর্মী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা কর্তনের কথা শুনেছি। কিন্তু ইয়ংওয়ান গ্রুপ তাদের কর্মীদের সুরক্ষায় কারখানা বন্ধ রেখেও এখন ছুটি থেকে বেতন-ভাতা সমন্বয় করছে। কর্তৃপক্ষ শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে এ নিয়ম চালু করেছে জানালেও কারখানাগুলোর অধিকাংশ শ্রমিকই এ বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিলেন না।