সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও কোথাও নিশ্চয়তা মিলছে, কোথাও মিলছে না। আতঙ্কে অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল কিনছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দুর্গম উপজেলাগুলোতে নৌযান চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়েছে। ঈদের পর পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় নৌ-চলাচল সীমিত করেছেন বোট মালিকরা। মজুদ রাখা জ্বালানি দিয়ে দুদিন নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখা গেলেও দ্রুত সরবরাহ না পেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর যাত্রী পারাপার ছাড়াও নিত্যপণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও রাঙ্গামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির তথ্য বলছে, রাঙ্গামাটি থেকে ১৯টি রুটে প্রতিদিন একটি থেকে চারটি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। জেলা শহর থেকে নিত্যপণ্য সরবরাহ, প্রত্যন্ত এলাকাগুলো থেকে সেখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন করেন স্থানীয়রা। কিন্তু ঈদের পর জ্বালানি সংকটের কারণে লঞ্চ ও পণ্যবাহী বোট চলাচল কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ না পেলে লঞ্চ চলাচল শতভাগ বন্ধ হয়ে যাবে বলে শঙ্কা জানিয়েছেন সংস্থা দুটির প্রতিনিধিরা।
রাঙ্গামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক নৌযান পরিচালনার জন্য দৈনিক দেড় হাজার লিটার ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানির প্রয়োজন হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে নৌযানের জন্য নির্ধারিত এজেন্ট প্রতিষ্ঠান সীমিত আকারে জ্বালানি সরবরাহ করেছে। ঈদের পর থেকে জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় আমাদের মজুদ কমে দুদিনে নেমে এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে নৌপথগুলোতে লঞ্চসহ বিভিন্ন অন্যান্য নৌযান বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রামের উপপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) নয়ন শীল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক প্রত্যন্ত উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন শত শত নৌযান চলাচল করে। এখন জুম চাষের মৌসুম হওয়ায় কৃষিপণ্য, নিত্যপণ্য, ঈদফেরত যাত্রী পরিবহনের চাপ রয়েছে। কিন্তু এজেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক নিয়মে জ্বালানি সরবরাহ না করায় হ্রদের হাজার খানেক নৌযান চলাচল ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আমরা বিষয়টি জানিয়ে পদ্মা অয়েল কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছি।’
লঞ্চ মালিক সমিতির তথ্য বলছে, রাঙ্গামাটির বেশ কয়েকটি দুর্গম উপজেলা ছাড়াও কাপ্তাই হ্রদের সঙ্গে সংযুক্ত খাগড়াছড়ির বেশ কয়েকটি উপজেলায় লঞ্চ চলাচল করে রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট থেকে। বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন অন্তত ৪০টি লঞ্চ, ৭০-৮০টি পণ্যবাহী লঞ্চ চলাচল করে। এছাড়া কাপ্তাই হ্রদের অভ্যন্তরে শতাধিক স্পিডবোট যাত্রী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কয়েকশ বোট প্রতিদিন পর্যটক পরিবহনে যুক্ত থাকলেও জ্বালানি সংকটে সার্ভিস বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সড়কপথের জ্বালানি বিপণনকারী এজেন্ট ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে ধারাবাহিক বিরতিতে সরবরাহ হলেও নৌযানের সঙ্গে যুক্ত এজেন্টদের প্রতি অনীহা দেখাচ্ছেন পদ্মা অয়েল কোম্পানির প্রতিনিধিরা। এতে যেকোনো সময় কাপ্তাই হ্রদে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হোসেন চৌধুরী। তার দেয়া প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পার্বত্য এলাকার কৃষি, বিদ্যুৎবিহীন মোবাইল নেটওয়ার্ক, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনে দ্রুত নিবন্ধিত এজেন্ট প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি সরবরাহ করা জরুরি। এছাড়া পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়সহ বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে নৌযানের জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স অনুকূল এন্টারপ্রাইজ। নৌযান মালিক সমিতি ও জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জরুরি চিঠি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। নিয়মিত এজেন্ট কিংবা ফিলিং স্টেশনগুলোর আগের রেকর্ড পরিমাপ করে রেশনিং করে হলেও জ্বালানি তেল দেয়া হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদের মাধ্যমে দুর্গম অনেক এলাকায় মানুষ ও পণ্য পরিবহন হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান জ্বালানি সংকটের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। নিময়মাফিক যোগাযোগ করলে জ্বালানি সরবরাহে কোনো বাধা নেই।’
তবে নৌযান মালিক ও জ্বালানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি, সড়কপথের এজেন্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি দেয়া হলেও নৌযানের জন্য পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক সড়ককেন্দ্রিক এজেন্ট থেকে বাড়তি দামে জ্বালানি সংগ্রহ করছেন নৌযান মালিকরা। নির্ধারিত এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নৌযান মালিক সমিতিকে ডিজেলসহ জ্বালানি সরবরাহ না করলে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।









