অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, বেসরকারি চাকরিজীবী, প্রবাসী ও শ্রমজীবী কাউকে বাদ দেয়নি এহসান গ্রুপ। এমনকি বিধবা ও গৃহিণীর টাকাও আত্মসাৎ করেছে গ্রুপটি। পরকালে মুক্তির দোহাই দিয়ে সুদবিহীন উচ্চ মুনাফার কথা বলে শুধু যশোরের ১৬ হাজার মানুষকে নিঃস্ব করেছে এ সংস্থার কর্মকর্তারা। আত্মসাৎ করেছে ৩২২ কোটি টাকা।
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান মুফতি মাওলানা রাগীব আহসান এসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এসব ভুক্তভোগী জানিয়েছেন অসহায়ত্বের কথা। ফেরত চেয়েছেন টাকা। শাস্তি চেয়েছেন রাগীব আহসান ও তার সহযোগীদের।
প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মসজিদের ইমাম ও খাদেমদের একটি অংশ এহসান গ্রুপে বিনিয়োগের জন্য গ্রাহক তৈরি করতেন। যশোরের প্রায় ১৬ হাজার গ্রাহকের ৩২২ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেয় তারা। টাকা গ্রহণের পরপরই সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা গা ঢাকা দেন। অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। টাকা না পাওয়া গ্রাহকের মধ্যে অনেকে মারা গেছেন, শয্যাশায়ী হয়েছেন কেউ। অভাব-অনটনের মধ্যে দিন পার করছেন অনেকে।
গচ্ছিত টাকা ফেরতের জন্য কয়েকজন মামলা করেছেন। অন্যরা একই পথে হাঁটছেন। যশোর শহরের বেজপাড়া চোপদারপাড়া এলাকার কাজী মফিজুল হক (৭৮)। তিনি পুলিশের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘অবসর
গ্রহণের পর হজ করি। হজ শেষে দেশে ফেরার পর শহরের দড়াটানা জামে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাই। সেখানকার ইমাম-মুয়াজ্জিন আমাকে জানান, ব্যাংকে টাকা রাখা হারাম। পরকালে জবাবদিহি করা লাগবে। তারা আমাকে বোঝাতে সক্ষম হন, এহসান গ্রুপে টাকা রাখলে হালাল হবে। এছাড়া ব্যাংকের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পাওয়া যাবে। তাই অবসরকালীন যে টাকা পাই, সেখান থেকে চার দফায় ৪০ লাখ টাকা দিই। লাখে মাসিক দেড় হাজার টাকা মুনাফা চার-পাঁচ মাস পাই। এরপর লভ্যাংশ দূরে থাক মূল টাকাও পাইনি। টাকা উদ্ধারে আদালতে মামলা করেছি।’
চোপদারপাড়া এলাকার বিধবা জুলেখা বেগম (৬৮) গচ্ছিত রাখেন প্রায় ১৬ লাখ টাকা। টাকা জমা দেয়ার কিছু রশিদ হারিয়ে গেছে। তবে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার রশিদ আছে তার কাছে।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় জামে মসজিদের ইমামের মাধ্যমে এহসান গ্রুপের নাম শুনি। ইমামের মাধ্যমেই এহসান গ্রুপে টাকা রাখি। বছরখানেক লভ্যাংশ পেয়েছি। লভ্যাংশ এবং মূল টাকা ফেরত না পেয়ে ২০২০ সালের অক্টোবরে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ১৮ জনকে আসামি করে মামলা করি।’
শহরের রামকৃষ্ণ রোড এলাকার বাসিন্দা মুস্তফা দ্বীন মোহাম্মদ (৭৮)। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। এহসান গ্রুপের অন্যতম পরিচালক মুফতি আতাউল্লাহ তাকে এ খাতে টাকা বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করেন। মুস্তফা ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা রাখেন। কিন্তু ১ টাকাও ফেরত পাননি।
শহরের বাড়ি বিক্রি করে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন রহিমা বেগম (৭০)। একেবারে নিঃস্ব রহিমা এখন শহরতলির ঝুমঝুমপুর ময়লাখানা এলাকার ভাঙা ঘরে বসবাস করেন। এরই মধ্যে দুই দফা তার স্ট্রোক হয়েছে। তিনি তার কষ্টের টাকাগুলো ফেরত চেয়েছেন।
যশোর শহরের শংকরপুরে ভিটেবাড়ির আট শতক জমি বিক্রির ১২ লাখ টাকা এবং নিজের জমানো ১ লাখ ২৫ হাজার টাকাসহ ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এহসান গ্রুপে রাখেন আফসার উদ্দিন (৬৭)। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে টাকা জমা রাখার পর ছয় মাস মুনাফা পান। এরপর গচ্ছিত টাকা ফেরত দেয়া নিয়ে টালবাহানা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।










