এআই-নির্ভর এ প্রযুক্তি বড় কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই টিস্যুর ক্ষতি কমিয়ে দ্রুত সুস্থ হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, যা দেশের আধুনিক চিকিৎসাসেবাকে আরো সমৃদ্ধ করছে বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল ঢাকার মাদানী এভিনিউয়ের ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত ইউনাইটেড হেলথকেয়ার হসপিটালে সফলভাবে অপারেশন দুটি সম্পন্ন করেন ডা. রফিকুস সালেহীন ও অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী)।

অপারেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা জানান, অস্ত্রোপচার দুটিতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ‘মেডবোট টুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’। প্রচলিত ল্যাপারোস্কপির চেয়ে এ রোবটের হাতগুলো ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরানো যায় এবং থ্রিডিতে শরীরের ভেতরে স্পষ্টভাবে দেখতে পারে। ফলে শরীরের অত্যন্ত সংকীর্ণ ও জটিল অংশেও আশপাশের রক্তনালি বা সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি না করে নিখুঁতভাবে অপারেশন করা সম্ভব। বিশেষ করে জটিল ক্যান্সার অপারেশনে টিউমার পুরোপুরি অপসারণে এ প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর।

অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীনের নেতৃত্বে প্রথম অস্ত্রোপচারটি ছিল পিত্তথলির পাথর অপসারণ বা ‘রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কোলিথিয়াসিস’ রোগে আক্রান্ত ৫৭ বছর বয়সী এক ডায়াবেটিস আক্রান্ত পুরুষ রোগীর ওপর এ অস্ত্রোপচার করা হয়। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এ অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় রোগী স্বাভাবিকভাবে জ্ঞান ফিরে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

প্রথমটি শেষ হওয়ার পরপরই অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী) দ্বিতীয় অপারেশনটিতে প্রবেশ করেন। এটি ছিল জরায়ু থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ৪৫ বছর বয়সী একজন নারী রোগীর জরায়ু কেটে ফেলার অস্ত্রোপচার বা ‘রোবোটিক হিস্টেরেকটমি’, যা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অপারেশনের ৩-৪ ঘণ্টা পরই রোগীকে পানি এবং পরদিন সকাল থেকে স্বাভাবিক খাবার দেয়া সম্ভব এবং সব ঠিক থাকলে দ্রুতই রোগীকে বাসায় ছেড়ে দেয়া হবে। এ নিয়ে অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘রোবোটিক সার্জারি চিকিৎসায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রোবোটিক আর্ম ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে পারে, যা মানুষের হাতের সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে জটিল স্থানে নিখুঁতভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। এতে রক্তনালি ও অঙ্গ নিরাপদ থাকে, কম কাটাছেঁড়া হয়, রক্তক্ষরণ কমে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়।’

অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী) জানান, শিগগিরই কার্ডিয়াক, নিউরো, ইউরোলজি, গাইনিকোলজি ও থোরাসিক সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তি চালু হবে। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হলো রোগীদের বিদেশে না পাঠিয়ে দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসা দেয়া, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে একটি রোবট-গাইডেড স্টেন্টিং প্রদর্শনী হলেও সেটি প্রকৃত সার্জিক্যাল রোবট ছিল না। এবারই দেশে প্রথম নিজস্ব মালিকানাধীন ও নিয়মিতভাবে পরিচালিত রোবোটিক সার্জারি ব্যবস্থা চালু হলো বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড হেলথকেয়ার। এ মাইলফলকের পেছনে রয়েছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ। এছাড়া সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরই দলটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে।

চিকিৎসকদের মতে, ভবিষ্যতে এ রোবট দিয়ে টেলিসার্জারি সম্ভব হবে—ফাইভ-জি বা স্টারলিংক ইন্টারনেট থাকলে বিদেশ থেকে বসেই বাংলাদেশে রোগীর অপারেশন করা যাবে। দেশের সব অঞ্চলে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়াই তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। খরচ এখন সাধারণ ল্যাপারোস্কপির চেয়ে আড়াই-তিন গুণ বেশি হলেও চিকিৎসকরা আশা করছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় কমে আসবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোবোটিক সার্জারি যুক্ত হওয়ায় ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের আধুনিক চিকিৎসাসেবা আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। জরুরি ও বিশেষায়িত সেবায় প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, যাতে রোগীরা দেশেই উন্নত চিকিৎসা পান এবং বিদেশনির্ভরতা কমে।