বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে পুরোপুরি বিভক্ত করে ফেলেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে এ দেশের মানুষ যে সংবিধান রচনা করেছিল, সেটাকে বারবার কাটাছেঁড়া করে অকার্যকর একটা সংবিধান করেছে তারা। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল ভিত্তি নষ্ট করে তারা যখনই সুযোগ পেয়েছে এটাকে ধ্বংস করেছে।’ গতকাল দুপুরে সিলেট মহানগর বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নিজেদের স্বার্থে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে ফেলেছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলেছে। দেশে আজ ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে। আমাদের আন্দোলন শুরু হয়েছে। গত আগস্ট থেকে ১৭ জন নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন। জীবিত সব নেতাকর্মীই হয়েছেন মামলার আসামি।’
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় বাকশাল কায়েমের কথা তুলে ধরে এর সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানে যে মৌলিক বিষয় ছিল, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সেটাকে ১৯৭৫ সালে তারা ধ্বংস করে দিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল গঠন করেছিল। যখনই তারা সুযোগ পেয়েছে ক্ষমতায় আসার তখনই তারা সংবিধানকে ধ্বংস করেছে। তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হাত দিয়েছে, নিষিদ্ধ করে এর কণ্ঠরোধ করেছে।’
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের বক্তব্য নিয়েও কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে দেশের মানুষ কেউ কি বিশ্বাস করে? তাদের নেতৃত্বে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, তারা কি বিশ্বাস করে?’ তখন উপস্থিত নেতাকর্মীরা ‘না’ বলে আওয়াজ দেন। তিনি আরো বলেন, ‘সরকার একটা ভয়ের রাজত্ব, ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছে। যে সরকার আমাদের সমস্ত অর্জন কেড়ে নিয়েছে, তাদের যেকোনো উপায়ে পরাজিত করতে হবে। তাদের বিতাড়িত করতে হবে। দেশে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।’
ধ্বংস হওয়া অর্থনীতি টেনে তোলা কঠিন মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে ধ্বংস করেছে যে এটাকে টেনে তোলা অত্যন্ত কঠিন। শুধু নিজেদের স্বার্থে, দুর্নীতির স্বার্থে আজ তারা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।’ এ সরকারের আমলে করা মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘তারা নাকি অনেক উন্নয়ন করেছে। এ উন্নয়নটা কার জন্য? এ উন্নয়ন গুটিকতক মানুষের জন্য। তারা পাতালরেল করছে, মেট্রোরেল করেছে। কত টাকা খরচ হয়েছে? যা খরচ হওয়ার কথা তার চেয়ে তিন গুণ খরচ করেছে।’
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের টাকা ছিনতাইয়ের কথা তুলে ধরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিএনপির এ নেতা। তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে! প্রকাশ্যে দিনের বেলায় চড়থাপ্পড় মেরে সোয়া ১১ কোটি টাকা নিয়ে যায়! পরে আবার ওরাই খুঁজে পায়, তার মধ্যে আবার ২ কোটি টাকা পাওয়া যায় না! আজকে আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা নিরাপদ বোধ করেন না এ দেশে। আজ কোথাও কোনো আইনের শাসন নেই।’
আদানির বিদ্যুতে লোকসান দেড় লাখ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার যে চুক্তি হয়েছে, এর সমালোচনা করে এ হিসাব দেন তিনি। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘অন্য দেশের চেয়ে দ্বিগুণ দামে আমাদের কয়লা কিনতে হচ্ছে। চুক্তির ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম দাঁড়াবে ইউনিটপ্রতি প্রায় ১৬ টাকা, যেটা এখন ৮ টাকার মতো।’ বিদ্যুতের দাম গত দুই মাসে তিনবার বাড়ানোর সমালোচনা করে তিনি আরো বলেন, ‘যদি চুরি বন্ধ করা যেত, তাহলে এতবার দাম বাড়াতে হতো না। কিন্তু তারা তাদের টাকা আয় করার জন্য, চুরি করতে বিদ্যুৎ সেক্টরকে বেছে নিয়েছে।’
সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকির সভাপতিত্বে ও সিলেট মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএমএ জাহিদ, দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, এনামুল হক চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বের অধিবেশনে সিলেট মহানগরের ২৭টি ওয়ার্ডের ১ হাজার ৯১৭ জন কাউন্সিলরের সরাসরি ভোটে মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। মহানগরের নেতৃত্বে আসতে সম্মেলনে তিন পদে আট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।









