গতকাল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উপস্থিত থেকে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে সরকার ও চীনা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিইআইজেড একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে বিনিয়োগই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। বর্তমান সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগ—প্রথমত বিনিয়োগ, দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ এবং তৃতীয়তও বিনিয়োগ। কারণ বিনিয়োগই দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রধান চালিকাশক্তি হবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সারওয়ার জামাল নিজাম, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনকিয়ান। এ সময় চট্টগ্রামের স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চ্যাংগুই, বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনকিয়ান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীসহ প্রায় ৭০ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে কয়েকটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষর হয়, সিইআইজেডের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার উদ্বোধন ছাড়াও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সিইআইজেডের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শুধু একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজের সূচনা নয়, বরং বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ দূর করছে এবং নিয়ন্ত্রণ ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু করেছে বর্তমান সরকার।’ বাংলাদেশ এখন ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাতদিন—সব সময় ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমাদের বার্তা স্পষ্ট, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। গ্রাউন্ডব্রেকিং শুধু নির্মাণকাজের সূচনা নয়; এটি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সেতুবন্ধের ভিত্তি। আমরা একসঙ্গে এমন একটি জোন গড়ে তুলতে চাই, যা নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, টেকসই প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।’
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘জুনে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং ও দালিয়ান সফরের পর ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই জোনে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশে একটি কারখানা স্থাপন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লেগে যায়। আমরা এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যার মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর কাজ ১৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে বহু দশকের অভিজ্ঞতার তুলনায় এটি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের গ্রাউন্ডব্রেকিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ফলাফল বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ নতুন ঐতিহাসিক সূচনালগ্নে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরো এগিয়ে নিতে, কৌশলগত সমন্বয় গভীর করতে এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত। দুই দেশের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যকে উন্নয়নের বাস্তব সুফলে রূপ দিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’
গত ১৭ জুন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সিইআইজেড বাস্তবায়নের জন্য গঠিত কোম্পানির সঙ্গে ডেভেলপমেন্ট এগ্রিমেন্ট এবং ল্যান্ড লিজ এগ্রিমেন্ট অনুমোদন করে। এ কোম্পানিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ৩০ শতাংশ এবং জেস চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) ৭০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে। বেজার অংশ হিসেবে অধিগ্রহণকৃত ভূমির ৫০ বছরের লিজমূল্য ইকুইটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডেভেলপার তাদের অংশ নগদ মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করবে, যা জোনের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত হবে।
প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক রোড, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেন সড়ক, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ৪ দশমিক ২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, দিনে ৬০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং প্রায় ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।










