নির্বাচন উপলক্ষে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে অর্থ লেনদেনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর অ্যাপভিত্তিক লেনদেন তথা ইন্টারনেট লেনদেনও বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্রুত অর্থ লেনদেনের এ দুটি মাধ্যম একেবারেই সীমিত হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের এটিএম বুথে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বহু এটিএম বুথে টাকা মিলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক বুথে মঙ্গলবার রাত থেকেই টাকা মিলছে না। এ সংকট বুধবার আরো তীব্র হয়। সাধারণ ছুটি থাকায় এদিন ব্যাংকগুলো বুথে নতুন করে টাকাও রাখেনি।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী মাহফুজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে কারওয়ান বাজারের বেশ কয়েকটি বুথ ঘুরেও টাকা তুলতে পারিনি। একটি বুথ থেকে তুলতে পারলেও মাত্র ৫ হাজার টাকা মিলেছে। পরে বনশ্রীতে গিয়ে একটি বুথ থেকে টাকা তুলেছি। টাকা না থাকা বুথগুলোর মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ও ভালো হিসেবে পরিচিত ব্যাংকের বুথও রয়েছে।’

প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেন মালিহা ইকবালও। কর্মজীবী এ নারী বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্বের কারণে ছুটি পাইনি। এ কারণে ঢাকায় থেকে যেতে হয়েছে। বুধবার টাকা তুলতে আফতাবনগর ও বাংলামোটর এলাকার বেশ কয়েকটি বুথ ঘুরতে হয়েছে।’

রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের এটিএম বুথেও কাঙ্ক্ষিত অংকের টাকা পাওয়া যাচ্ছে না বলে খবর পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে টানা চারদিনের ছুটি শুরু হয়েছে। ভোট দিতে কোটি কোটি মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরেছেন। বহু মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। এ কারণে বুথগুলোয় টাকা তোলার বাড়তি চাপ পড়ে। কিছু বুথের টাকা শেষ হয়ে যেতে পারে। আবার বৃহস্পতিবার ভোট হওয়ায় ওইদিন আর নতুন করে বুথে টাকা রাখার সুযোগ হবে না। ভোটের পর শুক্র ও শনিবার নতুন করে টাকা দেয়া হবে।’

নির্বাচন উপরক্ষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ আউট পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর বিরূপ প্রভাবও গ্রাহকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, ‘ব্যাংকের অ্যাপ দিয়ে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা স্থানান্তর পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এ কারণে জরুরি প্রয়োজনে “বিকাশ”-এ কিছু টাকা ক্যাশ-ইন করতে দোকানে গিয়েছিলাম। কিন্তু টাকা ঢোকানো যায়নি। ক্যাশ-ইনের পাশাপাশি ক্যাশ-আউটও বন্ধ রয়েছে বলে দোকানদার জানিয়ে দিয়েছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বুধবার থেকেই সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছে। সে কারণে গতকাল দেশের ব্যাংকগুলো বন্ধ ছিল। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী ব্যাংক খুলবে আগামী রোববার। নির্বাচনে কালো টাকার ছড়াছড়ি নিয়ন্ত্রণ ও ভোট কেনাবেচা ঠেকাতে গত রোববার ব্যাংক লেনদেনে বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সোমবার রাত ১২টা থেকে টানা ৯৬ ঘণ্টা বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা প্রতিবার সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা সেন্ডমানি করতে পারবেন। এক্ষেত্রে দৈনিক লেনদেন করা যাবে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাপ সেবা ব্যবহার করে একে অন্যকে টাকা পাঠানোর সেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। আজ বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত সেবাগুলো সীমিত থাকবে।

ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় (আইবিএফটির মাধ্যমে লেনদেন) ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে বলেও নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোকে নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বলা হয়েছে।

এটিএম বুথে টাকা না থাকা ও লেনদেনে ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা চারদিন সরকারি ছুটি হওয়ায় ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব ছিল এটিএম বুথে বাড়তি টাকা রাখা। কিন্তু কেন রাখল না, সেটি খতিয়ে দেখা হবে। ভোটের দিন বুথে নতুন করে টাকা রাখা সম্ভব হবে না। আশা করছি, শুক্রবার থেকে লেনদেন স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

অতীতে ঈদসহ লম্বা ছুটি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এটিএম বুথে পর্যাপ্ত টাকা রাখার নির্দেশ দেয়া হতো। কিন্তু নির্বাচনের ছুটিকে কেন্দ্র করে সে ধরনের কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি। আবার ঈদের সময় মোবাইল ব্যাংকিং ও অ্যাপভিত্তিক লেনদেন সেবাও পুরোপুরি সচল থাকত, যা এখন প্রায় বন্ধ রয়েছে।