গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সরকারি শিল্প-কারখানাগুলো দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে কার্যক্রমে গতি আনা এবং এসব শিল্প-কারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া বৈঠকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবন্ধী ৩ ব্যক্তির হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন প্রতিবন্ধীর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন। গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজ কার্যালয়ে প্রবেশের সময় তাদের হাতে তিনি এ নিয়োগপত্র তুলে দেন। এ নিয়োগপত্র তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে তিনি গতকাল সচিবালয়ে তার দিনের কর্মসূচি শুরু করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ কথা জানান।
কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়।
নিয়োগপ্রাপ্ত তিনজন হলেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার আয়শা আক্তার, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার নীলা খাতুন ও নড়াইল সদর উপজেলার মো. হাসমত আলী।
হাসান শিপলু জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি নিয়োগপত্র পেয়ে তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তাদের জন্য দিনটি ছিল নতুন কর্মজীবনের পাশাপাশি নতুন স্বপ্নেরও সূচনা। আয়শা আক্তার ও নীলা খাতুন দুজনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকা নীলা খাতুন পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাকে রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আয়শা আক্তারও পা দিয়ে লিখে সম্পন্ন করেন স্নাতকোত্তর। হাত না থাকায় মুখ দিয়ে নিয়োগপত্র গ্রহণ করেন তিনি। তাকে গাইবান্ধার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মো. হাসমত আলীকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এ সময় সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে প্রতিবন্ধী তিন ব্যক্তিকে চাকরি দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সাত্তার দুলাল। নিয়োগপত্র প্রদানের পর পরই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাকে ধন্যবাদ জানান।
জুলাইয়ের রক্তমাখা পতাকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ: মাথায় গুলির ক্ষত। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৩৬টি বুলেটের স্প্লিন্টারের চিহ্ন। জুলাই আন্দোলনের মাঠে গুরুতর আহত অবস্থায় মাথার রক্ত বন্ধ করতে যে জাতীয় পতাকা বেঁধেছিলেন, সে পতাকা রক্তে ভিজে গিয়েছিল। সে রক্তমাখা পতাকা হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন শেখ আজিজুর রহমান। গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে আজিজুরের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো। আজিজুরের ইচ্ছা ছিল ওই পতাকাটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে তুলে দেয়ার। গতকাল তিনি রক্তক্ষরণ ঠেকাতে মাথায় বাঁধা সে পতাকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
সম্প্রতি আজিজুরকে নিয়ে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও শুধু ছাত্রদল করার কারণে মেলেনি জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি’—শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে এলে তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে বিষয়টি খোঁজখবর নেয়ার নির্দেশ দেন। সাক্ষাতের জন্য নিয়ে তাকে আসা হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে আজিজুরের দুঃখ কষ্টের কথা শোনেন। তার আহত হওয়ার ঘটনা, লেখাপড়া, বর্তমান জীবনযাপন ও সিএনজি চালিয়ে শিক্ষাজীবনের খরচ চালানোর বিষয়সহ তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। তার জীবন সংগ্রামের কথাগুলো দারুণভাবে ব্যথিত করে প্রধানমন্ত্রীকে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শেখ আজিজুর রহমান জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পেরে আনন্দিত ও আবেগাপ্লুত। নিজের কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন এবং তার খোঁজখবর নিয়েছেন; এটিকে জীবনের স্মরণীয় একটি মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন তিনি।
আজিজুর বলেন, ‘পতাকাটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। আজ সে ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।’
আজিজুর রহমান সরকারি বাঙলা কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তার বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায়।
এত ত্যাগ আর অবদান যার, সেই যোদ্ধা ছাত্রদল করার কারণে দীর্ঘ দুই বছরেও পাননি জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি। সংসার আর লেখাপড়ার খরচ চালাতে ধরতে হয়েছে সিএনজিচালিত গাড়ির স্টিয়ারিং। জীবনের দুটি বছর কেটেছে নানা ঘাতপ্রতিঘাতে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে মিরপুর-১০ ফুটওভারে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে আলোচনায় আসেন আজিজুর। আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। আহত অবস্থায় মাথার গুলির ক্ষত ঢাকতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে নেন। রক্তে ভিজে যায় সে পতাকা। তবু রাজপথ ছাড়েননি। ১৯ জুলাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। দুদিনের রিমান্ড শেষে ২১ জুলাই মুক্তি পান তিনি। তবু ছাত্রদল করায় মেলেনি তার জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি।










