গত সেপ্টেম্বর মাসে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পরও একই মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বাড়ার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে মাসিক টু মাসিক ভিত্তিতে আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। যদিও গেল মাসে জ্বালানি তেল ছাড়াও ডিম, মাছ ও মুরগির দামও ছিল উর্ধ্বমুখী। বিবিএসের মূল্যস্ফীতির হিসাবে এমন তথ্যে বাজারের সঠিক চিত্র উঠে আসছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরেও মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় একই পর্যায়ে—৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তবে মাসিক টু মাসিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ১২ শতাংশ। আগস্টে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মাসিক মূল্যস্ফীতির হার অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।
বুধবার বিবিএসের প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের বাজারে যেখানে সেপ্টেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চে পৌঁছেছে এবং নিত্যপণ্যের দামও উর্ধ্বমুখী, সেখানে মূল্যস্ফীতি আগস্ট মাসের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ গত ২১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে সব জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা বা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া পেট্রোলের লিটার প্রতি দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা বা ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ে। অকটেনের দাম বাড়ে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। দাম বাড়ার পর ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
জ্বালানি তেল ছাড়া গেল মাসে বাজারের অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের দামও ছিল উর্ধ্বমুখী। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ে ডিমের। গেল মাসের শেষ সপ্তাহে মুরগির ডিমের ডজনের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হয় ১৬০ টাকায়। এছাড়া ব্রয়লার মুরগির দাম এখন কেজিপ্রতি ২০০ টাকা। প্রায় সবজির দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। যদিও বিবিএসের হিসাবে বলছে, সেপ্টেম্বরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। যা আগের মাসের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। যদিও মাসিক ভিত্তিতে কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৩৪ এবং আগস্টে ছিল ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেপ্টেম্বরে মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম আগস্টের তুলনায় ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মূলত জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ কমায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া পেয়াঁজের দাম বাড়ে ১০ টাকা পর্যন্ত। সরকারি তদারকির অভাবে অনেক ব্যবসায়ী সরবরাহ থাকা সত্ত্বে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
খাদ্যে মূল্যস্ফীতি খানিক বাড়লেও খাদ্য বর্হিভূত খাতে কমার তথ্য দিয়েছে বিবিএস। সংস্থাটির হিসাব মতে, খাদ্যবহির্ভূত খাতে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মাসিক ভিত্তিক হিসেবে মূল্যস্ফীতি কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম সরাসরি শুধু পরিবহন ব্যয় বাড়ায় না। এর প্রভাবে কৃষি, উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও সেবার খরচ বাড়ে। পরিবহন, সেচ ও বিতরণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্য ও সেবার দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিবিএসের মূল্যস্ফীতির হিসাবে বাজারের চিত্র উঠে আসছে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিবিএসের মূল্যস্ফীতি হিসাবের পদ্ধতি অনেক আগের। তারা যেটাকে ভিত্তি করে হিসাব করে সেটা অনেক পুরনো। এখানে ভোগ্যপণ্য ঝুড়ির আপডেট অনেক সময় আসে না। ভিত্তি আপডেট না করলে অনেক সময় প্রকৃত চিত্রটি সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। এখানে পদ্ধতিগত জায়গাটিতে তথ্যগুলো হালনাগাদ করা জরুরি। কনজাম্পশন বাস্কেটকে নিয়মিত হালনাগাদ করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হবে। তাহলে আমরা মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্রটা আরো ভালোভাবে পাব।










