রৌমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সম্প্রতি নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত এক ব্যক্তি এখানে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন। কিন্তু এখানকার চিকিৎসকদের কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ (পিপিই) নেই। চিকিৎসকদের নিরাপত্তাসামগ্রীর দাবি উত্থাপন করা হলে রংপুরের বিভাগীয় পরিচালকের দপ্তর থেকে চিকিৎসকদের বলা হয় পলিথিন ব্যবহার করতে।
শুধু রৌমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নয়, সারা দেশেই চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতদের জন্য পিপিইর ঘাটতি রয়েছে ব্যাপক। আবার যেগুলো রয়েছে, সেগুলোও মানসম্মত নয় বলে অভিযোগ চিকিৎসকদের।
চিকিৎসকরা বলছেন, পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই সেবা দিতে হচ্ছে তাদের। রয়েছে পিপিইর সংকট। একই পিপিই একাধিক চিকিৎসককে ব্যবহার করতে হচ্ছে। সরবরাহ করা হয়নি এন৯৫ বা সমমানের কোনো মাস্ক। অথচ বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের মতো চিকিৎসকরাও ব্যাপক হারে সংক্রমিত হচ্ছেন নভেল করোনাভাইরাসে। দেশে এ মুহূর্তে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট কতজন এ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন, তা নিয়ে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন (বিডিএফ) নামে চিকিৎসকদের একটি সংগঠনের হিসাব বলছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন ৬৫ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে গতকাল। আবার একজন চিকিৎসকের সুস্থ হয়ে ওঠারও খবর মিলেছে। এছাড়া ডাক্তারদের পাশাপাশি নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরও এ ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সেখানে কোনো এন৯৫ মাস্ক দেয়া হয়নি। সার্জিক্যাল মাস্ক যা দেয়া হয়েছে, সেগুলোর সংখ্যাও অপ্রতুল। আবার ডিসপোজেবল পিপিই সরবরাহ করে সেগুলো আবার ধুয়ে ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে। সেগুলোও সংখ্যায় খুব কম।
অন্যদিকে কুর্মিটোলা হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানেও পর্যাপ্ত পিপিই সরবরাহ করা হয়নি। আইসিইউর চিকিৎসকদেরও দেয়া হয়নি এন৯৫ মাস্ক। প্যাকেটের মোড়কে এন৯৫ লেখা থাকলেও সেগুলো খুবই নিম্নমানের ও নকল।
এ বিষয়ে বিডিএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশাসক ডা. নিরূপম দাস বণিক বার্তাকে বলেন, যথেষ্ট সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেয়ার কারণে চিকিৎসকদের মধ্যে করোনা আক্রান্তের হার বাড়ছে। যারা চিকিৎসাসেবা নিতে আসছেন, তাদের অনেকেই রোগ গোপন করে এ শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছেন। আবার অনেক চিকিৎসক কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের শিকার। চিকিৎসকরা নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ তাদের সংস্পর্শে এসে আরো অনেকেই আক্রান্ত হতে পারেন। যেসব চিকিৎসকের নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বড় একটি অংশ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের। তবে গত কয়েক দিনে স্থানীয় হাসপাতালগুলো থেকেও ডাক্তারদের করোনা সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরো জানান, এখন পর্যন্ত ডাক্তারদের যথেষ্ট পিপিই সরবরাহ করা হয়নি। আবার এন৯৫ বা সমমানের কোনো মাস্কও সরবরাহ করা হয়নি। কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য যেসব হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানেও চিকিৎসকদের জন্য এসব সুরক্ষা উপকরণের সংখ্যাঅপ্রতুল।
প্রসঙ্গত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, ইতালিতে কভিড-১৯ আক্রান্তদের প্রায় ১০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট। চীনে এ হার প্রায় ৪ শতাংশ। বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট রয়েছেন সাড়ে ৬ শতাংশের মতো।
এখন পর্যন্ত চিকিৎসকদের বাইরে নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ২৪ জনের নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাংলাদেশ নার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইসমাত আরা জানান, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ২৪ জনের মতো নার্স কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জন দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কর্মরত। বাকিরা বেসরকারি হাসপাতালের। আক্রান্তদের মধ্যে দুজন এরই মধ্যে সুস্থ হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্বাস্থ্যকর্মী জানান, টেস্ট কিটের স্বল্পতার কারণে নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরা চাইলেই টেস্ট করতে পারেন না। উপসর্গ দেখা দিয়েছে এমন নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে টেস্ট করলে এ সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বাড়বে। তবে যেসব নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে এ রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে সঙ্গেই আইসোলেশনে নেয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার। এর মধ্যে দেশে চিকিৎসা দিচ্ছেন ৬০-৬৫ হাজার। দেশে চিকিৎসা সেবাদাতা চিকিৎসকদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ২২-২৫ হাজার জন। বাকিরা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত। নিয়মিতভাবে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হলে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার পিপিই প্রয়োজন।
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগযোগ করেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।









