রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মূলত একটি রাজনৈতিক সমস্যা। তাই রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার ঢল শুরু হওয়ার পর তৎকালীন সরকার সংকট সমাধানে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়নি। তা করা গেলে শুরু হওয়ার চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই সংকট সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব হতো।
শামা ওবায়েদ বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। মিয়ানমারে সম্প্রতি নির্বাচন হয়েছে এবং নতুন সরকার এসেছে। একই সঙ্গে রাখাইন স্টেটে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তেও নানা ধরনের নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মানব পাচার ও মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গার প্রকৃত সংখ্যা কত, সেটিও সঠিকভাবে বলা কঠিন। প্রতিদিন কমবেশি নতুন মানুষ আসছে। পাশাপাশি বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩ লাখের বেশি হবে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাখাইন স্টেট, আরাকান এবং মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সংলাপ চলছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এটা একেবারেই একটি রাজনৈতিক সমস্যা। খুবই সংবেদনশীল এ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট জোরালোভাবে জানিয়েছেন, তারা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চেষ্টা করবেন। বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তুরস্কও সম্প্রতি বাংলাদেশকে জানিয়েছে, তারাও সংকট সমাধানে চেষ্টা করবে। মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় কিনা, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হবে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। সেখান থেকেও সংকট সমাধানে নতুন কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে করা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) থেকে বাংলাদেশ বের হয়ে আসবে কিনা বা এটি পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, এমওইউ থেকে বের হয়ে এলেই খুব একটা লাভ হবে বলে তিনি মনে করেন না।
বরং জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা বলার ক্ষেত্রে নতুন একটি শক্তি তৈরি হয়েছে কারণ বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেই সক্ষমতা আগামী এক বছরে ভালোভাবে কাজে লাগাতে চায় সরকার।
চীনের প্রস্তাবিত করিডোর কতটা কাজে দেবে—এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, আগের সরকার বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে যথেষ্ট সক্রিয় ছিল না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় তৎকালীন সরকারের মিয়ানমার ও চীনের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগের সক্ষমতাও ছিল না।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। জাতীয় স্বার্থ, সমঅধিকার ও মর্যাদা বজায় রেখে সরকার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে।
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বলছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলছে, তখন চীনসহ অন্যান্য অংশীজনও বাংলাদেশের বক্তব্য আরও গুরুত্বের সঙ্গে শুনছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এখন বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও দর-কষাকষির জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্ত হয়েছে।










