আপনি তো ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। ঢাকার মতো বিপুল জনসংখ্যার একটি রাজধানীর বিশদ পরিকল্পনা করতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন?

নগর পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রধান ভিত্তিই হলো তথ্য বা ডেটা। কিন্তু ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো এখানে নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ঢাকায় সেবা প্রদানকারী সংস্থা রয়েছে প্রায় ৫০টিরও বেশি। সব সংস্থার কাছে একই ফরম্যাটে ডেটা পাওয়া যায় না। আবার অনেক সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় ডেটা থাকলেও তারা তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে না। অথচ একটি ইন্টিগ্রেটেড বা সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে হলে প্রতিটি সংস্থার সঙ্গেই তথ্যের নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় প্রয়োজন। আমরা সাধারণত দুটি উৎস থেকে ডেটা সংগ্রহ করে থাকি—প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি। প্রাইমারি ডেটা আমরা শতভাগ নিখুঁতভাবে সংগ্রহ করতে পেরেছি; কারণ এটি আমরা নিজস্ব ফিল্ড সার্ভে বা সরজমিনে অনুসন্ধানের মাধ্যমে পেয়েছি। কিন্তু মূল সমস্যা তৈরি হয় সেকেন্ডারি সোর্সের ডেটা নিয়ে, যা বেশির ভাগ সরকারি বা সেবা সংস্থার কাছে সংরক্ষিত ছিল না। আমি মনে করি, ভবিষ্যতে বাসযোগ্য শহর গড়তে হলে সব সেবা সংস্থারই উচিত তাদের নিজস্ব ডেটার একটি হালনাগাদ ডিজিটাল ভার্সন তৈরি করা এবং তা একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার অধীনে সংরক্ষণ করা।

ডেটা সংকটের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ সামলানো। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম মেগা সিটি। এখানকার প্রতিটি মানুষ ও গোষ্ঠীর নিজস্ব ও ভিন্নধর্মী স্বার্থ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের এক ধরনের স্বার্থ, পরিবেশবাদীদের এক ধরনের দাবি, নগর পরিকল্পনাবিদদের পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি, রিয়েল এস্টেট খাতের বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ, আবার সাধারণ মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত রিকশাচালক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া মানুষের ভিন্ন জীবন বাস্তবতা। এ বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রহণযোগ্য সিচুয়েশন তৈরি করা যে কতটা কঠিন, তা ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থেকে টের পেয়েছি। আমি নিঃসংকোচে বলতে পারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে নগর পরিকল্পনা বা অন্য যেকোনো পলিসি ডকুমেন্টের ক্ষেত্রে ড্যাপের মতো এত বিপুল পরিমাণ স্টেকহোল্ডার কনসাল্টেশন ও পাবলিক এনগেজমেন্ট আর কখনো হয়নি। নানামুখী স্বার্থের সংঘাতকে প্রশমিত করে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে এনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জনস্বার্থ রক্ষা করা এবং পরিশেষে সরকারের অনুমোদন নিয়ে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করাই ছিল বড় পরীক্ষা। সবার সহযোগিতায় আমরা সফলভাবেই ড্যাপের গেজেট প্রকাশ করতে পেরেছি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বারবার সংশোধন করে ব্যবসায়ীদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন ড্যাপ নগর পরিকল্পনাবিদদের হাতছাড়া হয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে।

২০২২ সালে ড্যাপ গেজেট হওয়ার পর এরই মধ্যে এটি দুইবার সংশোধন করা হয়েছে। আর প্রতিটি সংশোধনীর ধাপেই কিন্তু সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বসেই আলোচনা করা হয়েছে। এখন যারা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত আছেন, তাদের একটা ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকবেই। আবার সব ব্যবসায়ী যে খারাপ বা শহরের ক্ষতি চান—তাও তো নয়। তাদের অনেকের মধ্যেও শহরের ভালোর জন্য ইতিবাচক চিন্তা রয়েছে। সবকিছু মিলিয়েই কিন্তু তাদের বক্তব্য শোনা হয়েছে। আর এ কাজটা রাজউক কখনো একা করেনি। রাজউক এখানে পেশাজীবী সংগঠন যেমন ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস, এমনকি পরিবেশবাদী সংগঠন ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও সঙ্গে রেখেছে। বিশেষ করে সর্বশেষ যে সংশোধনীটা আনা হলো তাতে কিন্তু সব পক্ষের যৌথ সম্মতি ও স্বাক্ষর রয়েছে। তারা সবাই এতে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। এখানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) মূলত একজন ‘আম্পায়ার’-এর ভূমিকা পালন করেছে। আমরা সব পক্ষের মতামত গ্রহণ করে সরকারের অনুমোদন নিয়ে একটা চূড়ান্ত ডকুমেন্ট তৈরি করেছি মাত্র। এখন এ সংশোধিত ডকুমেন্টটি একটি আদর্শ শহরের জন্য সঠিক হয়েছে কিনা—সেই মানদণ্ড এবং বিচার ভবিষ্যতে নগরবাসীই করবেন।

শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের অববাহিকায় যেসব বড় অবকাঠামো আছে, সেগুলো ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজউকের দুটো সমীক্ষাতেই কিন্তু ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট এসেছে। তারপরও রাজউক কীভাবে ওই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবনের প্ল্যান পাস করেছে?

ইউআরপি প্রজেক্টের এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো কিন্তু আমরা পেয়েছি ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ হওয়ার অনেক পর। ফলে মূল ড্যাপ প্রণয়নকালে এ সিসমিক ডেটাগুলো সমন্বয় করে একটি ‘রিস্ক-সেনসেটিভ ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান’ বা ঝুঁকি-সংবেদনশীল ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা তৈরি করার সুযোগ তখনকার মতো কম ছিল। একই সঙ্গে অতীতে আমাদের দেশে অনেক পরিকল্পনা মূলত বিভিন্ন অ্যাজাম্পশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তখন যে ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনাগুলো করা হয়েছিল, আজ এ সময়ে এসে মনে হতে পারে সেখানে দূরদর্শিতার ঘাটতি ছিল। আপনি যে বালু নদ ও শীতলক্ষ্যার অববাহিকার কথা বলছেন—১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার পর ঢাকা শহরকে রক্ষার জন্য ‘ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান’ (ফ্যাপ) নামে একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে ঢাকার চারপাশ রক্ষায় দুটি বাঁধের সুপারিশ করা হয়—ওয়েস্টার্ন এমব্যাংকমেন্ট এবং ইস্টার্ন এমব্যাংকমেন্ট। পশ্চিমের বাঁধটি নির্মিত হলেও পূর্বাঞ্চলীয় বা ইস্টার্ন এমব্যাংকমেন্টটি আজও নির্মিত হয়নি, যদিও প্রকল্পটি বাতিলও হয়নি। তখনকার ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়েছিল, ইস্টার্ন এমব্যাংকমেন্ট হয়ে গেলে বালু নদের অববাহিকা এলাকাটি সম্পূর্ণ বন্যামুক্ত হয়ে যাবে এবং সেখানে নগরায়ণে কোনো সমস্যা হবে না।

সেই ধারণাকে ভিত্তি করেই ১৯৯৫ সালের ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ (ডিএমডিপি) ওই এলাকাকে ‘ফিউচার আরবার এক্সপ্যানশন এরিয়া’ বা ভবিষ্যতের নগর সম্প্রসারণ এলাকা হিসেবে দেখানো হয়। এমনকি ২০০৬-০৮ সালের দিকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটি স্টাডিতেও বলা হয়েছিল, ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ‘ইস্ট ঢাকা’র ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইস্টার্ন এমব্যাংকমেন্ট এখনো হয়নি, অথচ অববাহিকা এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন হয়ে গেছে। ওই সময় আমাদের হাতে মাটির নিচের সয়েল কন্ডিশন বা ‘সিসমিক জোনিং ম্যাপে’র মতো বৈজ্ঞানিক ডেটা ছিল না, যা আমরা সম্প্রতি আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের মাধ্যমে পেয়েছি। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো ভৌগোলিক স্থানেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব, তবে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এখন এ ভূকম্পন ঝুঁকি ও মাটির কাঠামোগত তথ্যগুলো জানার অধিকার কিন্তু সাধারণ জনগণের রয়েছে, যা এতদিন অ্যাভেইলেবল ছিল না।

ড্যাপ প্রতি পাঁচ বছর পরপর রিভিউ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২২ সালে ড্যাপ গেজেট হয়েছে, সেই হিসেবে ২০২৭ সালে আমাদের পরবর্তী রিভিউ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। আমরা আশা করছি, পরবর্তী আপডেট ড্যাপে আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের ‘রিস্ক-সেনসেটিভ ল্যান্ড ইউজ ম্যাপ’র তথ্যগুলো একটি নির্দিষ্ট ‘লেয়ার’ হিসেবে যুক্ত করে জনসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। তখন ডেটাটি মানুষের কাছে খুব বোধগম্য হবে। কোনো এলাকার মাটির বিন্যাস কেমন, কোথায় ফাউন্ডেশন লেয়ার কত গভীর হতে হবে, কিংবা কোন এলাকা বেশি বা কম ঝুঁকিপূর্ণ—তা দেখে নাগরিক ও বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

আইন অনুযায়ী রাজউক কোনো পার্ক বা গণপরিসর কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দিতে পারে না। কিন্তু গুলশান-বনানীর পার্ক ও মাঠ বিভিন্ন ক্লাব-সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় গিয়ে বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

প্রথমত, রাজউক কিন্তু এগুলো কাউকে ‘লিজ’ দেয়নি। রাজউক শুধু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছে। রাজউক পার্ক বা মাঠ তৈরি বা ডেভেলপ করলেও নিজস্ব কোনো মেইনটেন্যান্স ফান্ড নেই। যেহেতু আমরা নগরবাসীর কাছ থেকে কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স বা নিয়মিত সার্ভিস চার্জ আদায় করি না, তাই এলাকাভিত্তিক যে সোসাইটিগুলো রয়েছে বা যারা ওই এলাকার মূল সুবিধাভোগী, পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের ওপরই দেয়া হয়। অনেক সোসাইটি বা ক্লাব এ সুযোগে পার্কের ভেতর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিংবা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছে। এ জায়গাটিতে এখন রাজউক কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, তাদের মধ্যে দুই-একটি ক্লাবের সঙ্গে রাজউকের সম্পাদিত স্মারক বা সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে। আর ভবিষ্যতে কাউকে এ ধরনের স্থায়ী দায়িত্ব দেয়ার কোনো সুযোগ রাখা হচ্ছে না। এখন থেকে এক বা দুই বছর মেয়াদে তাদের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে চুক্তি নবায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক, যাতে মূল শর্ত ভঙ্গ করলেই সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাদ দেয়া যায়।