আপনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার বিষয়ে জানতে চাই।

ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা দেয়ার সময়ই একদিন মাইকে ভেসে আসে ইয়াহিয়া খানের ভাষণ—‘পূর্ব পাকিস্তানের নাশকতাকারী কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ সেই ভাষণই আমাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। পরীক্ষার হলে এ ভাষণ শুনে আমি অন্যমনস্ক হয়ে যাই। তখন এক পরীক্ষক আর্মি অফিসার এসে আমাকে বলেন, ‘ওখানে (পূর্ব পাকিস্তানে) কী হচ্ছে ভুলে যাও, পরীক্ষায় মনোযোগ দাও।’ আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার পরীক্ষা, প্রমোশন বাদ। পাক আর্মির চাকরি এখানেই শেষ। সেই ভাবনা বাস্তবায়ন করার জন্য অন্য বাঙলি অফিসারদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসি। অংশ নিই সমরযুদ্ধে।

পাকিস্তান থেকে আপনারা কীভাবে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন? 

পাকিস্তান আর্মি অফিসারদের তৎকালীন সব ক্লাবে ফ্রি যাতায়াত ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালানোর আগে সিনিয়র-জুনিয়র আর্মি অফিসারদের টোকেন (আর্মি অফিসারদের বেতন থেকে কেটে নেয়া অর্থ) নিয়ে ক্লাবে পার্টি দেয়া হয়। জুলাইয়ের প্রথম দিকে পালানোর আগে এক পাকিস্তান আর্মি বন্ধুর বাসায় রাত্রিযাপন (পরদিন ছিল রোববার—সাপ্তাহিক বন্ধ) করেছিলাম। কিন্তু পূর্বপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে পাকিস্তানি আর্মি অফিসার বন্ধুকে না জাগিয়ে পালিয়েছিলাম। ওই বন্ধু যাতে ঘুম থেকে জেগে উঠতে না পারে সেজন্য গাড়িটি স্টার্ট না দিয়ে গেট থেকে হাতে ঠেলে নিয়ে যাই। এরপর গাড়ি চালিয়ে একে একে তুলে নিই অন্য তিন বাঙালি অফিসারকে। 

প্রথমে ঝিলম থেকে গাড়িতে তুলে নিই ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীকে। মঞ্জুর ওঠেন শিয়ালকোট থেকে, অ্যাবোটাবাদ থেকে তাহের রাওয়ালপিন্ডিতে অপেক্ষায় ছিলেন। সেখান থেকে গাড়িতে উঠে রওনা হই ভারত সীমান্ত পাড়ি দেয়ার জন্য। শিয়ালকোটে এসে সীমান্ত পার হতে প্রায় দুই মাইল আগেই গাড়ি ফেলে রাখি ঝোপের আড়ালে। সঙ্গে ছিল মঞ্জুরের স্ত্রী ও দুই সন্তান।

পরিকল্পনামাফিক মঞ্জুরের সন্তানদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে সবাই মিলে কাঁধে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিই। পালানোর সময় যাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা না পড়ি সেজন্য ভোর পর্যন্ত সীমান্তবর্তী একটি শুকনো খালে লুকিয়ে ছিলাম। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রথমেই সবাই যাই বিএসএফ (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী) হেডকোয়ার্টারে। সেখানে রিপোর্ট করার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় পাঠানকোট। সেখানে এক রাত রেখে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হোটেলে রাখা হয় প্রায় ১৫ দিন। দিল্লিতেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসে দেখা করেন কর্নেল ওসমানী। পূর্ব পাকিস্তানে ফেরার আগে কলকাতায় ছিলাম ৭ নং পার্ক স্ট্রিটে। সেখানেও ওসমানী, তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল। 

ফিরে আসার পরের ঘটনাগুলো নিয়ে আপনার কাছে শুনতে চাই। 

পূর্ব পাকিস্তানে এসে একটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব নিই। ওই ব্যাটালিয়নে ছিলেন প্রায় ৮০০ রেগুলার সৈনিক। আগস্টের উত্তাল সময়ে সৈনিকদের মনোবল ছিল ভঙ্গুর অবস্থায়। আমি এসে সৈনিকদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে ছোট ছোট অপারেশনে পাঠিয়ে সাফল্য নিয়ে আসি। এতে সৈনিকদের মনোবলও চাঙ্গা হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়েই বড় অপারেশনের দিকে মনোযোগী হই। মেজর ওয়াকার আমার অধীনে যুদ্ধ করেছিল। 

জেড ফোর্সের হয়ে আপনি যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে কি?

জেড ফোর্সের বিভিন্ন বাহিনীসহ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানকে মুক্ত করতে যুদ্ধ শুরু করি। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে টানা যুদ্ধ চলাকালীন আত্মরক্ষা ও যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একাধিক বাহিনী মিলে হাইল হাওর পাড়ি দিয়েছিলাম রাতের আঁধারে। ওই সময়ে সৈনিক কিংবা উচ্চ পদের অফিসাররা যারা উচ্চতায় খাটো ছিলেন তাদের কাঁধে করেই সারা রাত পাকিস্তানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে চুপিসারে মৌলভীবাজারের হাওর পাড়ি দিয়েছিলাম, যার জন্য ওসমানী সাহেব আমাকে পছন্দ করতেন। আমাকে তিনি দালাই লামা বলে ডাকতেন।