সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি করেছেন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) ভুক্তভোগীরা। আজ শনিবার (১১ জানুয়ারি) ভয়েস ফর রিফর্ম ও ডিএসএ ভিক্টিম নেটওয়ার্কের যৌথ আলোচনা সভা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এ দাবি জানানো হয়েছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সভায় সদ্য অনুমোদন পাওয়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪ (খসড়া)- এর বিভিন্ন বিতর্কিত ধারাগুলোর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করা হয়।
ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনা ও মানবাধিকার কর্মী শহিদুল আলমের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে গত সরকারের আমলে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের নির্যাতনের শিকার বেশ কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক শিমু নাসের নতুন ডিজিটাল সিকিউরিটি অধ্যাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ ধারাগুলো উপস্থাপন করেন এবং সেগুলো কীভাবে বাকস্বাধীনতা রোধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে তা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারকৃত চারজন ব্যক্তি বক্তব্য রাখেন। ইশরাত জাহান রেইলি, একজন তরুণী যিনি ছাত্র অবস্থায় ২ বছর ৭ মাস কোনো অপরাধ করা ছাড়াই সাজা ভোগ করেছেন। তিনি তার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ ছাড়াও গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার ও মো. আল আমিন, তাদের বিনা অপরাধে নিজেদের সাজা ভোগ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা জানান, জামিনের আবেদন কোনো কারণ ছাড়াই বেশ কয়েকবার খারিজ করা হয়েছে। দিদারুল ভূঁইয়া, যিনি নিহত মোস্তাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট কিশোরের সঙ্গে একই মামলায় কারাভোগ করেছেন, অভিযোগ করেন যে ডি এস এ মামলার কোনো আসামিদের মামলা ওঠানো না হলেও সরকারের একজন উপদেষ্টার মামলা আগস্ট মাসে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি অবিলম্বে সকল ডিএসএ ও আইসিটি অ্যাক্টের (৫৭ ধারা) অধীনে সহস্রাধিক মামলা উঠিয়ে নেয়ার দাবি জানান।
মিডিয়া সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান সাংবাদিক কামাল আহমেদ বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদে বেশ কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী থাকা সত্ত্বেও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের মতো একটি কালো আইন তৈরি হতে যাচ্ছ।
উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা বলেন, পূর্বোক্ত আইনটির অপপ্রয়োগ করে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা কার্যত স্তব্ধ করে ভীতি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শাসন কায়েম করতে সফল হয়েছিল।
তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আশা ছিল, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ আইন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে তার পরিবর্তে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকারভিত্তিক একটি জনমুখী, সুচিন্তিত, সুসংগত ও সুশাসনমূলক আইন প্রণয়ন করা।
এ অধ্যাদেশের সবচেয়ে খারাপ ও আপত্তিকর অংশ ধারা ৩৫ এবং ৩৬, যেটা অনুযায়ী পুলিশ বিনা পরোয়ানায় যে কারো ফোন, ল্যাপটপ বা যেকোনো ডিভাইস জব্দ ও তল্লাশি করতে পারে এবং ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তার বিশ্বাস করার কারণ থাকলেই তল্লাশি ও গ্রেফতারের অনুমতি তাদের দেয়া হয়েছে এ দুই ধারায়।
যে বাংলাদেশের পুলিশের দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সর্বজনবিদিত, যেখানে জুলাইয়ের পর পুলিশের জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া উচিত ছিল, তা না করে পুলিশের হাতে জন হয়রানির একটা নতুন হাতিয়ার তুলে দেয়া হচ্ছে। পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি এবং গ্রেফতার কোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না। এটি সরাসরি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ধারা ৮-এ বলা হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি মনে করে কোনো তথ্য বা উপাত্ত দেশের সংহতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করতে পারে তাহলে তারা মহাপরিচালকের অনুমতি সাপেক্ষে এ তথ্য প্রচার ব্লক করে দিতে পারে। সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এই ধারা অপব্যবহারের পথ খুলে দেয়া হচ্ছে। যদি কোনো ব্যক্তি বা সংবাদমাধ্যম সরকার বা আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর দুষ্কর্ম তুলে ধরার সাহস করে তাহলে তাকে অনায়াসে এ আইনের আওতায় নিয়ে আসা যাবে।
অধ্যাদেশ অনুসারে, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রের চাকরিরত কর্মকর্তারা দেশের সংহতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ইত্যাদির সংজ্ঞা নির্ধারণ করবেন এবং তা লঙ্ঘন হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করার পর বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে এমন বেপরোয়া কর্তৃত্ববাদী আইন কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
ধারা ২৫ ও ২৬-এ ব্যক্তিগত হয়রানি, অপমান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলা হয়েছে যা অত্যন্ত আপেক্ষিক একটি বিষয়। এই ধারার আওতায় কাউকে হয়রানির উদ্দেশে খুব সহজেই কারো বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব।
ক্ষমতাসীন সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতে কার্টুন এবং প্যারোডির ব্যবহার হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। কিন্তু গত ১৫ বছরে সরকারকে সমালোচনা করে কোনো কার্টুন প্রকাশ করা হলে তার সঙ্গে জড়িতদের দুর্বিষহ অত্যাচার করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মিম, দেয়ালচিত্র ও কার্টুন ছিল আমাদের অন্যতম শৈল্পিক হাতিয়ার। অথচ ধারা ২৫-এ আরো বলা হয়েছে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন বা অপমান করার উদ্দেশে তৈরি স্থিরচিত্র, ভিডিও, গ্রাফিক্স ইত্যাদি যার কোনো শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই, এমন উপাত্ত প্রকাশ বা প্রচার আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু এখানে শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তা বলা হয়নি। অপমান বা হেয় করার ব্যাপারটিও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এর মাধ্যমে শুধু শিল্পীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে না, সৃজনশীলতার অধিকারও কেড়ে নেয়া হচ্ছে। একটি চিত্রের শৈল্পিক মূল্য আছে কি নেই তা পুলিশ নির্ধারণ করতে পারে না।
সভাপতির বক্তব্যে আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহিদুল আলম বলেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মানবাধিকার কিংবা জনগণের স্বার্থের লেন্স ব্যবহার না করে নিপীড়নের লেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীকে অনেক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শেখ মুজিব, মেজর জিয়াউর রহমান মারা গেছেন। ক্রসফায়ার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম, নিপীড়ন যা যা হওয়ার সবই তারা করেছে। ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার ও মাটি থেকে গুলি করে কিংবা পুড়িয়ে মানুষ মেরেছে, তাদের ক্ষমতায়ন করার জন্য আমরা এ আইন বানাচ্ছি। সাংবাদিকতাকেও যদি ক্রিমিনালাইজ করা হয়, তখন মিডিয়া বলে কিছু থাকবে না। পিআর হাউজ হয়ে যাবে। যা এরই মধ্যে হয়েছে। আমাদের ডিভাইস যেভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেভাবে ফেরত দেয়া হয় কিনা সে ফরেনসিকও করা হয় না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তাদের অনেকেই বলেন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। এ আইনের বেশ কিছু ধারা সেগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই নতুন অধ্যাদেশের খসড়া অবিলম্বে বাতিল করে সবার মতামতের ওপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র সাইবার অপরাধগুলো থেকে নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য নতুন আইন কাঠামো তৈরি করার দাবি জানানো হয়েছে।










