কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের বাসিন্দা দিয়া খাতুন। শারীরিক প্রতিবন্ধী দিয়ার পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন তার বাবা বাচ্চু মিয়া। তবে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনিও কয়েক মাস ধরে কাজে যেতে পারছেন না। পাড়া-প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোমতে খাবার জোগাড় হতো পরিবারটির। যদিও কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তারাও এখন আর পরিবারটির খোঁজখবর নিচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগেই ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি এ পরিবারের দ্বারে। তাই জীবন-জীবিকা নিয়ে বড় সংকটে দিনাতিপাত করছে প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা এ পরিবার।

পার্শ্ববর্তী রাজারহাট উপজেলার বালাকান্দ মুক্তারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা প্রতিবন্ধী শাহাজাহান আলীর পরিবারের অবস্থাও একই। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য তার দিনমজুর বাবা ওসমান আলী। করোনা পরিস্থিতিতে কোনো কাজ না থাকায় জীবন-জীবিকা নিয়ে সংকটে থাকা এ পরিবারও এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি।

দিয়া ও শাহাজাহানের মতোই জীবন-জীবিকার সংকটে পড়ে দুঃসময় পার করছেন হতদরিদ্র পরিবারের অসংখ্য প্রতিবন্ধী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার এ সময়ে জীবন-জীবিকা নিয়ে বড় সংকটে পড়েছে হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এক্ষেত্রে যেসব হতদরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধী রয়েছে, সেগুলোর জীবিকার সংকট সবচেয়ে বেশি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, কভিড-১৯-কে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশেরই মানবেতর সময় কাটছে। তবে সবচেয়ে সংকটে দিন কাটাচ্ছে হতদরিদ্র পরিবারগুলো। আবার সব হতদরিদ্র পরিবার এক নয়। যেসব হতদরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধী রয়েছে, সেগুলোর সংকটের তীব্রতা অনেক বেশি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার প্রতিবন্ধীরা খুবই দুঃসময় পার করছেন। তাদের ত্রাণ সহায়তাও ঠিকমতো পৌঁছে না। এসব পরিবার নিয়ে গবেষণাকাজ করতে গিয়ে দেখেছি, তারা প্রায় সব দিক থেকে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। তাদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি যথেষ্ট সঙ্গিন। আর আয় না থাকায় স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থান—সব দিক থেকেই অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করে প্রতিবন্ধী এসব পরিবার। তাই করোনার এ সময় সংকট আরো বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

তিনি আরো বলেন, সরকার যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর উপকারভোগী হবে আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীরা। তবে অনানুষ্ঠানিক খাত ও কর্মহীনদের জন্য এখনো ওই অর্থে নির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আমরা যদি সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করি, তাহলে যারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও বঞ্চিত, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।

গত বছর কুড়িগ্রামের বেশ কয়েকটি হতদরিদ্র পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল-হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন (এইচআই) বাংলাদেশ প্রোগ্রাম। এ প্রকল্পের প্রভাব নির্ণয়ের লক্ষ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রাথমিক পর্যায়ের একটি বেজলাইন সার্ভে পরিচালনা করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি)। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ‘র্যানডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল অন দ্য ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ পভার্টি গ্র্যাজুয়েশন মডেল বেজলাইন রিপোর্ট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রাম জেলার দুটি উপজেলায় প্রতিবন্ধী রয়েছে এমন ৬৮৬টি হতদরিদ্র পরিবারে জরিপ চালিয়ে এসব পরিবারের প্রতিবন্ধী ও অন্য সদস্যদের শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও আয়বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, খাদ্যনিরাপত্তায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে প্রতিবন্ধীদের এসব পরিবার। গবেষণা প্রতিবদন অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ তিনবেলা খেতে পারে না। কার্তিক মাসে এ সংকট প্রকট হয়। মূলত আয় না থাকার ফলেই তারা খাদ্য সংকটে রয়েছে। এছাড়া বন্যা ও শীতকালের ঠাণ্ডাকে কাজ ও খাবার সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

হ্যান্ডিক্যাপের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক প্রতিবন্ধীই কোনো ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। আর যারা কাজ করছেন, তাদের বেশির ভাগই দিনমজুর। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে। বিয়ের বয়স হওয়া সত্ত্বেও অর্ধেক প্রতিবন্ধীই অবিবাহিত। প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসার সুযোগ খুবই কম। মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসা নিতে যায়।

এইচআইয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর জন লুগু বণিক বার্তাকে বলেন, অনেক হতদরিদ্র পরিবারের একাধিক সদস্যও প্রতিবন্ধী রয়েছেন। কিছু পরিবারে দু-একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি থাকলেও এখন তারা কর্মহীন। তাই কভিড-১৯-০এর কারণে এ ধরনের প্রতিবন্ধী পরিবারগুলো অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া এসব পরিবারের শিক্ষার হারও অনেক কম। করোনা থেকে বাঁচার জন্য যেসব সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো প্রতিবন্ধীদের মধ্যে অনুসরণের অভ্যাস নেই বললেই চলে। তাই সচেতনতার অভাবে এসব পরিবারের সদস্যদের করোনার ঝুঁকিও অনেক বেশি।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮।