দেশের চা শিল্পে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দেশের শীর্ষ চা বাগান, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়েছে। আজ শনিবার চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত ৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে এ সম্মাননা ও সনদ তুলে দেয়া হয়।

এবার একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান। সর্বোচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগানের স্বীকৃতি পেয়েছে মধুপুর চা বাগান। শ্রেষ্ঠ চা রফতারিকারকের পুরস্কার পেয়েছে দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড।

শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্র চা উৎপাদনকারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান। শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য শ্রেষ্ঠ চা বাগানের সম্মাননা পেয়েছে মির্জাপুর চা বাগান।

চা পণ্যের উদ্ভাবনী বাজারজাতকরণ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন চা মিশ্রণ বাজারজাতকরণের জন্য দুটি পৃথক ক্যাটাগরিতে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড।

শ্রমিক ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারীর সম্মাননা পেয়েছেন নেপুচা চা বাগানের জেসমিন ওরাওঁ। জাতীয় চা দিবসের বিশেষ পুরস্কার হিসেবে শ্রেষ্ঠ বোতলজাত চা কারখানা নির্বাচিত হয়েছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল এলাকার সৃষ্টি টি লিমিটেড।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব সম্মাননা দেশের চা শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধি, গুণগত মান উন্নয়ন, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং শ্রমিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের চা শিল্পকে আরো এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে।

এর আগে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চা শিল্পকে আরো আধুনিক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি আরো বলেন, দেশে বর্তমানে ১৬০টির বেশি চা বাগান এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র চা বাগান জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতারি হচ্ছে, যা দেশের জন্য গর্বের বিষয়।

চা শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, তাদের কঠোর পরিশ্রম ছাড়া এ শিল্প এতদূর এগিয়ে আসতে পারত না। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, উন্নত আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।

মুজিবুর রহমান চৌধুরী আরো বলেন, শ্রীমঙ্গল শুধু দেশের চা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল। সবুজ চা বাগান, হাওর, ছড়া, জাতীয় উদ্যান এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের চা পর্যটন গড়ে তোলার বড় সুযোগ রয়েছে। এজন্য তিনি সরকারের কাছে শ্রীমঙ্গল পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে শ্রমিক, মালিক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চা শিল্পের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ চা বোর্ডের সব কার্যক্রম ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের চা শিল্পের তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে ‘বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি’ এবং ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে দুটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও উন্নতমানের বিভিন্ন ক্লোন চা উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চা শিল্পকে আরো বহুমুখী ও রফতারিমুখী করতে জেসমিন চা, গোলাপ চা, লেবু চা, মসলা চা ও চকোলেট চাসহ বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত চা উৎপাদনে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, বিএনপির শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, বট লিফ টি মালিক সমিতির সভাপতি নিয়াজ সিদ্দিকী, টি প্ল্যান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ মাইনুদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশ চা সংসদের সভাপতি কামরান টি রহমান।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চা মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। এ সময় তারা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে চা উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতবিনিময় করেন।