ত্রিশোর্ধ্ব চামেলী ১১ বছর আগে যখন তার স্বামীর ঘরে আসেন তখন তার বসতবাড়ি থেকে পদ্মা নদীর দূরত্ব ছিল প্রায় ২০০০ ফুট। ১১ বছরের ব্যবধানে এবার তিনি বসতভিটা হারিয়ে ফেললেন। আপাতত দুই সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ঠাঁই নিচ্ছেন বারুইপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের কাছাকাছি একটি সরকারি জায়গায়। স্বল্প আয়ের সংসারে নতুন জমি কিনে ঘর তৈরি করা তার কাছে বেশ দু:স্বপ্নের মতো।
চামেলির মতো বারুইপাড়া ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রাম থেকে এ বছর পদ্মার ভাঙনে ভিটে ছাড়া হয়েছেন প্রায় ৫ জন। ভাঙনের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রায় আরো ১৫ জন। এই ১৫ জনের ১ জন হলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী আলমগীর হোসেন মৃধা। তিনি জানান, ঐ গ্রামে তার বাস পৈতৃক সূত্রে। পিতা মারা গেছেন প্রায় ২৬ বছর আগে। এবার পিতৃভূমি হারাতে যাচ্ছেন পদ্মার ভাঙনে। তিনি জানান, এ মাসের মধ্যে ভিটে যাবে। অপেক্ষায় আছেন তিনি।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তিন ইউনিয়নে পদ্মা নদীতে ভাঙন নতুন নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই এই ভাঙনের খবর গণমাধ্যমে আসছে। থেমে থেমে এই ভাঙন এগিয়ে এলেও কয়েকদিন হলো ভাঙন তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। এর ফলে এলাকার বসতবাড়ি, কৃষিজমি, গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বসতবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন অনেকে। কেটে নিয়ে গেছেন নদীর পাড়ের গাছপালা।
এতে উপজেলার তালবাড়ীয়া ইউনিয়ন, বহলবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাহেবনগর, বারুইপাড়া ইউনিয়নের মির্জানগরের বসতবাড়ি, কৃষিজমি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, কবরস্থান, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ও জাতীয় মহাসড়কসহ সরকারি স্থাপনা ভাঙনের কবলে পড়েছে।
রোববার (২০ অক্টোবর) বিকালে বারুইপাড়া ইউনিয়নের মির্জানগরে পদ্মা নদীর অংশে দেখা যায়, পদ্মার আগ্রাসী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় মীর আব্দুল করিম কলেজ, মির্জানগর কবরস্থানসহ অসংখ্য স্থাপনা।
এ ছাড়া কয়েক মিটার দূরেই কুষ্টিয়া-পাবনা জাতীয় মহাসড়কটিও হুমকির মুখে। মির্জানগর কবরস্থান কমিটির কোষাধ্যক্ষ আশরাফুল ইসলাম বলেন, পদ্মার ভাঙন কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় চলে এসেছে। অচিরেই কবরস্থান নদীতে চলে যাবে। তিনি বলেন, পাশেই রয়েছে একটি কলেজ। সেটিও ভাঙনের হুমকির মুখে আছে।
সাহেবনগর এলাকার মওদুদ আহমেদ রাজিব বলেন, কোনোমতেই ঠেকানো যাচ্ছে না নদীর ভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রতিদিন জিও ব্যাগ ফেলা হলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। জিও ব্যাগসহ নদীর পাড় ও গ্রাম রক্ষা বাঁধ এরইমধ্যে ভেঙে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এরই মধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে জাতীয় গ্রিডের তিনটি বৈদ্যুতিক টাওয়ার। গত এক সপ্তাহে সাহেবনগর, মির্জানগর, তালবাড়ীয়া এলাকায় প্রায় ১০০ একর বেশি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।
পদ্মা নদী রক্ষা কমিটির নেতা মুফতি ইয়াকুব বিন আজমল বলেন, পদ্মায় পানি কমার কারণে সম্প্রতি ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে স্থানীয় সাহেবনগর জামিউল মাদরাসা ভবন।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, পদ্মায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব এলাকায় ভাঙন তীব্র হচ্ছে, সেসব এলাকায় ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।










