নতুন নানা রুট ও সেবার পরিসর বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রতি বছরই একাধিক নতুন ট্রেন চালু হয় বিভিন্ন রুটে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইঞ্জিন সংকট। বাড়তি ট্রেন চালুর সম্ভাবনা থাকলেও শুধু ইঞ্জিনের অভাবে এ খাতে সরকারের একাধিক বড় বিনিয়োগের সুফল মিলছে না। সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রেলপথ উদ্বোধন হলেও এখনো মাত্র দুটি ট্রেন সার্ভিসের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।
একসময় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে মোট ইঞ্জিন ছিল প্রায় ২০০টি। কমতে কমতে সেটি এখন নেমে এসেছে ১৫০টিতে। এর মধ্যে শ খানেক প্রতিদিন চলাচলের উপযোগী। ফলে নতুন একটি ট্রেন চালু হলেই অন্য রুটের ট্রেন থেকে ইঞ্জিন নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে বিঘ্নিত হচ্ছে স্বাভাবিক রেল চলাচল। যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো শিডিউল বিপর্যয় কিংবা নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে গন্তব্যে পৌঁছালেও বাতিল হচ্ছে পণ্যবাহী ট্রেন। এতে রেলওয়ে আয়বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্যিক খাতের গ্রাহকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত নভেম্বরে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দুই জোড়া ট্রেন চালুর নির্দেশ দেন। ১ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে এক জোড়া ট্রেন সার্ভিস চালু হলেও চট্টগ্রাম থেকে এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি।
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ব্যাপক চাহিদার কারণে এ রুটে চলতি মাসে আরো একটি ট্রেন সার্ভিস চালু করা হয়। যদিও স্বল্প দূরত্বের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে একাধিক ট্রেন সার্ভিসের পরিকল্পনা করা হলেও ইঞ্জিন সংকটে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। রেলের পরিবহন বিভাগও বিষয়টি স্বীকার করছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্প শেষ পর্যায়ে চলে আসায় ঢাকা-কক্সাজার, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ বিভিন্ন রুটে একাধিক ট্রেন সার্ভিস বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়নে রানিং স্টাফ, ইঞ্জিন ও কোচ প্রয়োজন। যে ইঞ্জিন রয়েছে সেগুলো বিদ্যমান ট্রেনেই ব্যবহার হচ্ছে। কীভাবে নতুন সার্ভিস চালানো হবে, পুরনো ট্রেনগুলো কীভাবে চালানো হবে সে বিষয়ে আমরা চিন্তিত। তবে আমদানি হওয়ার আগ পর্যন্ত ইঞ্জিন মেরামতের মাধ্যমে সেবা চালু রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন রয়েছে ১৫৩টি। ২০২৩ সালে এগুলোর মধ্যে তিনটিকে চলাচলের অনুপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। প্রতিদিন ১১৬টি ইঞ্জিনের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য ৭২টি, পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য ১৩, শান্টিংয়ের জন্য ১৬, শাটলের জন্য দুটি, বিটি/প্রকল্পের জন্য দুটি এবং রিলিফ ট্রেন ও অন্যান্য মিলিয়ে ১১টির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ১০০টি। যাত্রীবাহী ১৬০টি ও আটটি কনটেইনার ট্রেনের জন্য ৭২টি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেয়া হলে প্রতিটি ইঞ্জিন গড়ে প্রতিদিন ২ দশমিক ৬৫টি ট্রেনে যুক্ত হয়। বরাদ্দের শতভাগ সরবরাহ না হওয়ায় পূর্বাঞ্চলে একটি ইঞ্জিন প্রতি ২৪ ঘণ্টায় গড়ে তিনটি ট্রেন পরিচালনা করে। দীর্ঘদিনের পুরনো ইঞ্জিনের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
একই চিত্র দেখা গেছে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলেও। সিংহভাগ ব্রড গেজ লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন পরিচালনাকারী এ অঞ্চলে দেড় শতাধিক ইঞ্জিনের মধ্যে প্রতিদিনের চাহিদা ১০০টিরও বেশি। এর মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য ৬২টি, পণ্যবাহী ১৯, শান্টিং পাঁচটি, প্রকল্পে চারটি, বিটি দুটি ও রিলিফ ট্রেন বা আর্মি স্পেশালে তিনটি ইঞ্জিন পাওয়া যায়। ২৮টি ইঞ্জিন মেইনটেন্যান্স স্পেয়ার হিসেবে থাকে। ফলে অধিকাংশ ইঞ্জিন একাধিক ট্রেনে সংযুক্ত করে ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা করা হয়। একটি ইঞ্জিন দিয়ে সক্ষমতার চেয়েও বেশি ট্রেন পরিচালনার কারণে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ও পথিমধ্যে ট্রেন বিকল হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এসব ঘটনা ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা ও শিডিউলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১১টি মিটার গেজ ইঞ্জিন আমদানি করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি থেকে ৩০টি সর্বশেষ প্রযুক্তির ইঞ্জিন আমদানি হয় ২০২১ সালে। এগুলো আমদানির পর রেলের বহরে থাকা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুরনো ইঞ্জিন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো দিয়ে দেশের প্রধান প্রধান রুট ছাড়াও ভারী ও দীর্ঘ রুটের পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ সিরিজের বেশ কয়েকটি ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে একটিকে পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ (কেলোকা) কারখানায় মেরামতের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। আরো দুটি মেরামত করা হচ্ছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর কারখানায়। রেলের বর্তমান সার্ভিস পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা এসব নতুন ইঞ্জিন সার্ভিসিংয়ে আটকে থাকায় ট্রেন পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা দেশকে ট্রেন নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার পথে হাঁটলেও ইঞ্জিন আমদানিজনিত জটিলতায় এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না। ২০০৯ সালে ৭০টি ইঞ্জিন কেনার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও ঋণের সুদহারসহ নানা জটিলতায় সেটি ভেস্তে যায়। আবার বিশ্বব্যাপী মিটার গেজ ইঞ্জিনের চাহিদা না থাকাও একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কোচ, রেল ট্র্যাক উন্নয়নসহ নানা খাতে বিনিয়োগ হলেও অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে যথাসময়ে ইঞ্জিন আমদানিতে রেল কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। এখন উদ্যোগ নেয়া হলেও ইঞ্জিন দেশে পৌঁছতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। এ তিন বছরের মধ্যে আরো অনেক ইঞ্জিন পরিত্যক্ত হয়ে যাবে। ফলে অবিলম্বে এটি আমদানির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যমান ইঞ্জিনগুলো মেরামতের দিকেও বিশেষ নজর দেয়া জরুরি। অন্যথায় রেলসেবা অব্যাহত রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।’
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ সূত্র বলছে, নিরবচ্ছিন্ন পণ্য পরিবহনে পূর্বাঞ্চলে অন্তত ২৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। এর পরও শিডিউল অনুযায়ী স্বাভাবিক চাহিদা রাখা হয়েছে ১৬টি। এক বছর আগেও প্রতিদিন ১২-১৫টি ইঞ্জিন সরবরাহ দেয়া হতো। বর্তমানে সেটি কমিয়ে ৮-১০টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে ঢাকা (কমলাপুর) আইসিডি, সিলেট অঞ্চল, রংপুর অঞ্চলে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। কক্সবাজারে নতুন রেলপথ নির্মাণ হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী এ রুটে অন্তত ১৯ জোড়া ট্রেন চলাচল করবে। এসব ট্রেন পরিচালনার জন্য ইঞ্জিন না থাকায় পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের শিল্প, জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্যশস্য পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ইঞ্জিন বরাদ্দ কমে যাওয়ায় পূর্বাঞ্চলে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমছে। আবার যেগুলো চালু আছে পুরনো ইঞ্জিন বরাদ্দের ফলে সেগুলোরও রানিং টাইম বেড়েছে। এতে পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন সংকট তীব্র, এটা সত্য। নতুন বেশ কয়েকটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হওয়ায় পণ্যাবহী ট্রেনের ইঞ্জিন দেয়া কমে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি দুর্ঘটনায় তিনটি ইঞ্জিন অকার্যকর হয়ে পড়ায় সংকট আরো বেড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘৭০টি নতুন মিটার গেজ ইঞ্জিন কেনার প্রকল্প বাতিল হয়ে যাওয়ায় সংকটের মাত্রা বেড়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে এ সংকট কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব নয়।’
পাহাড়তলী থেকে দোহাজারী পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথকে ব্রড গেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্প সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটার গেজ ইঞ্জিন সংগ্রহ করবে রেলওয়ে। ২০২৮ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ইঞ্জিন সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতে চায় রেলওয়ে। ফলে রেলের বহরে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হতে অন্তত আরো তিন বছরের মতো সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










