তবে যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাত্রার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় যানজট ও দুর্ঘটনা। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, দেশের মহাসড়কগুলোয় এখনো শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে, যেগুলো ঈদযাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে। প্রায় ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ এ পথেই রয়েছে ৪৫টি যানজটপ্রবণ স্থান, যেখানে ঈদ মৌসুমে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা থাকে। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কই নয়, সারা দেশের মহাসড়কে মোট ২০৭টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এছাড়া বিভিন্ন মহাসড়কে রয়েছে ২৮৫টি অধিক দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান; যেখানে অতিরিক্ত গতি, সড়কের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বা অনিয়মিত যান চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানকে ঘিরে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার এলাকা, সেতুসংলগ্ন স্থান এবং টোল প্লাজাগুলোয় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। পাশাপাশি যানজট নিরসনে টহল ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও জোরদার করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ঈদের সময় সড়কে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই যানজটপ্রবণ স্থানগুলোয় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর বিষয়ে চালকদের সতর্ক করতে বিভিন্ন নির্দেশনা ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত গতি, উল্টো পথে চলাচল এবং অননুমোদিত যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি রাখা হবে বলেও জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি যানজটের সম্ভাবনা রয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে। এ পথে অন্তত ৫৫টি স্থান যানজটপ্রবণ। রাস্তার পাশে অবৈধভাবে যানবাহন পার্কিং, তেল পাম্প এবং বিভিন্ন সংযোগ সড়কের কারণে মহাসড়কটি অত্যন্ত যানজটপ্রবণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাইপাইল, চন্দ্রা, মির্জাপুর, হাটিকুমরুল, শেরপুরসহ আশপাশের এলাকাগুলোয় প্রায়ই যানবাহনের জট লেগে থাকতে দেখা যায়।

যানজটের ঝুঁকির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ সড়কের ৪৫টি স্থান যানজটপ্রবণ। আর খানাখন্দে ভরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে ৪৩টি। এ মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ গোলচত্বর থেকে সরাইলের শাহবাজপুর পর্যন্ত মাত্র ১২ কিলোমিটার সড়কে রয়েছে অন্তত নয়টি বড় গর্ত। দীর্ঘদিন সড়কের সংস্কারকাজ না হওয়ায় আলগা মাটি সরে গিয়ে এসব গর্ত তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর মধ্যে আশুগঞ্জ গোলচত্বর পার হয়ে চিশতী ফিলিং স্টেশনের সামনে মহাসড়কে বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় গোলচত্বরের অনেক আগে থেকেই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

এছাড়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ১৪টি করে যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে রয়েছে নয়টি এবং যশোর-খুলনা মহাসড়কে রয়েছে ছয়টি যানজটপ্রবণ স্থান।

সবচেয়ে বেশি যানজটপ্রবণ ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কের দায়িত্বে থাকা হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঈদযাত্রায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলে চলাচলকারী যানবাহনের চাপ কমাতে হাটিকুমরুল এলাকায় বিকল্প সড়ক ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহাসড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও স্বেচ্ছাসেবকরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করবেন।’

যানজটের পাশাপাশি মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাকস্পট’গুলোও নিরাপদ ঈদযাত্রার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে হাইওয়ে পুলিশ। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মহাসড়কগুলোয় মোট ২৮৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে কুমিল্লা অঞ্চলে, মোট ৮৭টি। দাউদকান্দি সেতু থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত সড়কে থাকা ১১টি ইউটার্ন ও বিভিন্ন সংযোগ সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে গাজীপুর অঞ্চল। এখানে মহাসড়কের খুব কাছাকাছি গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্প-কারখানা এবং সংযোগ সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এরপর রয়েছে মাদারীপুর অঞ্চল, যেখানে ৩৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান। সড়কের বাঁক এবং অনুমোদনহীন যানবাহন চলাচল এসব স্থানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এছাড়া বগুড়ায় ৩০টি, সিলেটে ২০টি, খুলনায় ১৮টি ও রংপুরে আটটি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ।

নিরাপদ ঈদযাত্রা আয়োজনে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার কথা জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (মিডিয়া) মুনতাসীর রনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ এবং যানজটমুক্ত রাখতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন মালিক-শ্রমিক, বিআরটিএ, সড়ক এবং মহাসড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় সভা করা হয়েছে। অধিক দুর্ঘটনাপ্রবণ এবং যানজটপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের রেগুলার ফোর্সের পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকেও স্বেচ্ছাসেবী দেয়া হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।’

মুনতাসীর রনি আরো বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে মহাসড়ক থ্রি হুইলার ও সিএনজি অটোরিকশামুক্ত রাখা। এছাড়া প্রবাসীদের যাতায়াতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এক্ষেত্রে জেলা পুলিশও সমন্বিত টহলে অংশ নেবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় ওয়াচ টাওয়ার থাকবে। পাশাপাশি বাস টার্মিনালগুলোয় সচেতনতামূলক মাইকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’ সার্বিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধানে এবারের ঈদযাত্রায় হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সব কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন বলেও তিনি জানান।