বৃষ্টিপাত হয়েছে পর্যাপ্ত। আবহাওয়াও পুরোপুরি অনুকূলে। তার পরও চলতি মৌসুমে দেশের চা উৎপাদনে ধস নামিয়েছে মহামারীর প্রাদুর্ভাব। এ কারণে মৌসুমের শুরুতে রেকর্ড চা উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত গতবারের সমান উৎপাদন হওয়া নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশে মোট চা উৎপাদন হয়েছিল রেকর্ড ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি। এর আগে ২০১৮ সালে দেশে মোট চা উৎপাদন হয়েছিল ৮ কোটি ২১ লাখ ৩৪ হাজার কেজি। চলতি মৌসুমে তা প্রথমবারের মতো ১০ কোটি কেজি ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ছিল খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের। কিন্তু মহামারীর প্রাদুর্ভাবে উৎপাদনে ধস নামায় এ প্রত্যাশা পূরণ এখন এক প্রকার অসম্ভব হয়ে উঠেছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পণ্যটির উৎপাদন পরিসংখ্যানে।

চা বোর্ড থেকে সর্বশেষ প্রকাশিত মাসিক উৎপাদন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে চা উৎপাদন হয়েছে ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৫২ হাজার কেজি। যেখানে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার কেজি। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন কমেছে ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার কেজি। এখন পর্যন্ত দেশে চা উৎপাদন পিছিয়ে রয়েছে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ।

চা উৎপাদনের সবচেয়ে অনুকূল আবহাওয়া হচ্ছে পরিমিত বৃষ্টিপাত এবং রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। চলতি মৌসুমে দেশে বৃষ্টিপাত হয়েছে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত, যা চা বাগানগুলোয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল। তবে মার্চ থেকে কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে সারা দেশে সাধারণ ছুটি থাকায় চায়ের বিপণন নেমে আসে অর্ধেকে। এ কারণে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশের ১৬৭টি বাগানে পণ্যটির উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে চা উৎপাদনের ভরা মৌসুম হলো জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এ চার মাসে দেশে করোনা সংকটের কারণে চা বিপণন কমে যাওয়ায় বাগান মালিকরা লোকসানে রয়েছেন। উৎপাদন বাড়ানো হলে তাদের খরচও বাড়বে। কিন্তু নিলামের বাজারে চায়ের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় মালিকরা চা উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহী নন। এর প্রভাব পড়েছে দেশের চা উৎপাদনে। বাগান মালিকরা বলছেন, চলতি মৌসুমের শেষার্ধে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়া থাকলেও বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে পণ্যটির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে তাদের মধ্যে এখন আর কোনো আগ্রহ নেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশী চা সংসদের মহাসচিব এম শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত মহামারীর কারণে মানুষের আর্থিক সংকটে চা খাতও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিপণন অর্ধেকে নেমে আসায় বাগানগুলোর উৎপাদনও কমে গেছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আগের অবস্থানে ফিরে আসেনি। চা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিজনিত কারণে চায়ের উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে পণ্যটির দাম বাড়েনি। ফলে উৎপাদনকারীরাও চা উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী নন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে চা উৎপাদনের সেরা মৌসুম বর্ষাকাল। অন্যদিকে পণ্যটির ভোগ সবচেয়ে বেশি হয় শীত মৌসুমে। ওই সময়ে দেশে চা বিপণন বেড়ে যায়। চলতি বছর করোনা সংকটের কারণে মার্চ থেকে পণ্যটির বিপণনে ধস নামে। পাশাপাশি আসন্ন শীতেও করোনার দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণপ্রবাহ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে আগামী কয়েক মাসে দেশে চা বিপণন ফের কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাগান মালিকরা। এ সময়ে বাগানগুলোতেও উৎপাদন কমিয়ে দেয়ার কথা ভাবছেন অনেকেই।

চা বোর্ডের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাসভিত্তিক উৎপাদনে পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে চলতি মৌসুম। চলতি বছরের মে ও জুলাই ছাড়া ১০ মাসের মধ্যে আট মাসেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চা উৎপাদন কমেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে জুলাইয়ে। এ সময়ে দেশে চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার কেজি। প্রায় সমপরিমাণ উৎপাদন হয়েছে সেপ্টেম্বরে, ১ কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার কেজি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম উৎপাদন হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। ওই সময়ে দেশের চা বাগানগুলোয় মোট উৎপাদন হয়েছে মোটে ২৬ হাজার কেজি চা।