সম্প্রতি দেশজুড়ে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শিক্ষার্থীদের হত্যা, নির্যাতন ও গণগ্রেফতারের ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে কার্যালয় থেকে তার ছবি নামিয়ে ফেলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা। বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

অধ্যাপক সুলতানা বলেন, আমার কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি নামিয়ে ফেলেছি। এটি সত্যি। ন্যায্য এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সহিংসতা চালিয়ে, শিক্ষার্থীসহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করে তিনি দেশকে অনিরাপদ করে তুলেছেন। ন্যায্য আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নামা শিক্ষার্থী-শিক্ষক, এমনকি নারী শিক্ষকদেরও লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর তিনি আর সাধারণ মানুষের হৃদয়ে নেই। যিনি মানুষের হৃদয়ে নেই, তিনি কীভাবে দেয়ালে থাকতে পারেন! আমি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছবি নামাইনি। বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যে প্রেরণা নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন, সেই চেতনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যকলাপে ধূলিস্যাৎ হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণ করে তিনি যদি গণতান্ত্রিক উপায়ে আবার সরকার গঠন করেন, যেভাবে আমি তার ছবি নামিয়েছি আবার সেভাবেই দেয়ালে তুলব।

প্রধানমন্ত্রীর ছবি নামিয়ে ফেলার মাধ্যমে তিনি সরকারবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করলেন কিনা, বণিক বার্তার এমন প্রশ্নের জবাবে শামীমা সুলতানা বলেন, রাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভূমিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অর্জন ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। তার আগে ভাষা আন্দোলনে ১২ জন শহীদ হয়েছিলেন। তাতেই যদি দেশ এতটা উত্তাল হতে পারে, শাসকদের এতটা মূল্য দিতে হয়, তাহলে সাম্প্রতিক এতগুলো মৃত্যুর দায় তো সরকারকে নিতেই হবে। স্বাধীনতার আগে ও পরে এ ধরনের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, হামলা-মামলা ও ধরপাকড় নজিরবিহীন। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই।

অধ্যাপক সুলতানা বলেন, মানুষ ঘরেও নিরাপদ ছিল না। ঘরের ভেতরেও মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। রাস্তায় নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের ওপর নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী সহিংসতা চালিয়েছে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়েছে, রাস্তায় ট্যাংক নামিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মায়ের কোলের শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের দায় সরকারের ওপর বর্তায়। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি এমন কারো ছবি আমার দেয়ালে রাখতে পারি না যার হাতে আমার সন্তানদের রক্ত লেগে আছে। আমার শিক্ষার্থীরা যখন এই ছবি আমার দেয়ালে দেখবেন, তারা আহত হবেন। আমি তা চাই না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে সরকারিসহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি টাঙানোর নির্দেশ রয়েছে, তা সত্ত্বেও তিনি ছবি নামিয়ে রাখতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক সুলতানা বলেন, ওটা কোনো আইন নয়। বিজ্ঞপ্তিমাত্র। তাছাড়া সাম্প্রতিক ঘটনায় সরকার এবং আইনশৃঙ্খলারক্ষীদের যে ভূমিকায় আমরা দেখেছি, তা কি আইনসঙ্গত? যদি তারা এমন গুরুতর বিষয়ে আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সরকারি নির্দেশনা মানার বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন অবান্তর।

বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যা করে দেশকে মেধাশূন্য করার অপচেষ্টা করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমি চাই এদেশের মায়েরা তাদের সন্তান হারানোর ত্যাগের মূল্যায়ণ পান, তাদের সন্তান হত্যার বিচার পান।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতির কার্যালয়ের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে অধ্যাপক সুলতানাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। তার পেছনের দেয়ালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি থাকলেও তার পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিটি দেখা যাচ্ছিল না।