শুকনো মৌসুমেও ঝালকাঠিতে সুগন্ধা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। এতে জেলা নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামটির বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হতে চলছে। অব্যাহত ভাঙনে গ্রামটির শত শত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। বিত্তবানরা অন্যত্র জমি কিনে বসতভিটা ত্যাগ করলেও নিম্নবিত্তরা সব হারিয়ে হচ্ছে নিঃস্ব। সরই গ্রামের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর বর্ষায় নদীভাঙন হলেও এবার শুকনো মৌসুমেও ভাঙছে নলছিটির সরই গ্রামের একটি অংশ। এ বছর তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। এ বছর জুন থেকেই ঝালকাঠি জেলার সুগন্ধা বিষখালী এবং হলতা নদীর ভাঙন বিগত বছরের তুলনায় অনেকটা বেশি। সুগন্ধা নদীর প্রবেশমুখ বিষখালীর তীরে থাকা একটি সাইক্লোন শেল্টার চলতি বছরের ২৬ আগস্ট নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, বরিশাল-খুলনা নৌ রুটের ঝালকাঠি অংশে এলপি গ্যাস বহনকারী জাহাজের ঢেউয়ের চাপে শাখা নদীগুলোতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে নদী খনন বা ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন এবং দ্রুতগতির নৌযানের ঢেউয়ের কারণে ক্ষতির শিকার হয় নদীর তীর।

কুলকাঠি ইউনিয়নের সরই গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক আব্দুল জব্বার তালুকদার বলেন, প্রতি বছর সুগন্ধা নদীর দক্ষিণ পাড় ভাঙছে। সরই এলাকার নদীর পাড় থেকে গত কয়েক বছরে প্রায় ৬০টি পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে।

একই এলাকার নুর মোহাম্মদ বলেন, সরই গ্রামের অনেকে নিজেদের ভিটেমাটি হরিয়ে রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছে। আমার নিজের যতটুকু জমি আছে তা দু-এক বছরের মধ্যে নদীগর্ভে চলে যাবে।

অবসরপ্রাপ্ত তহশিলদার আব্দুল হক তালুকদার বলেন, যে জায়গায় আমি অনেক বসতঘর দেখেছি সেখান থেকে এখন লঞ্চ চলচল করে। নদী এখন আমার বাড়ির কাছে চলে আসছে। আমি হয়তো ভবিষ্যতে নিজ ভিটায় থাকতে পারব না।

নদীভাঙনের শিকার শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার জন্মস্থানের ঘরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ৫০ বছরেও এ স্থানটিতে ভাঙন রোধে কোনো সরকার উদ্যোগ নেয়নি। সরই গ্রামের ভাঙন রোধে বর্তমান সরকার প্রধানের কাছে গ্রামবাসীর পক্ষে আমার আকুল আবেদন রইল।

স্থানীয় বাসিন্দা মোসাম্মৎ নিপা বলেন, নদী এখন আমার ঘরের পাশে, নদীর পাড় তো ভাঙছেই, সেই সঙ্গে এলপি জাহাজগুলো এত দ্রুতগতিতে চালায় যে তুফানে আমাদের ঘর কেঁপে ওঠে। তাতে ভাঙনের তীব্রতাও দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।

নদীপাড়ের বাসিন্দা সুখী বেগম বলেন, যাদের জমি ভেঙে যাচ্ছে তারা ওই জমির মাটি ইট ভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাতে ভাঙন আরো বেড়েছে, এছাড়া গ্যাস কোম্পানির জাহাজের ঢেউয়ে বাড়ির উঠানে পানি চলে আসে। ছোট বাচ্চাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখি। যাতে নদীতে পড়ে না যায়। রাতেও ঘুম আসে না কখন যেন নদীতে ভেসে যাই।

মোজাম্মেল মোল্লা বলেন, সরকারিভারে নদীভাঙন বন্ধ না করা হলে দু-এক মাসের মধ্যে আমরা আর নিজ ভিটায় থাকতে পারব না। কোথাও গিয়ে ঘর তোলার টাকাও আমার নেই।

চুন্নু তালুকদার বলেন, নদীর তীরে ব্লক দিয়ে ভাঙন ঠেকানো না হলে আমাদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে যাবে।

কুলকাঠি ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড সদস্য বেল্লাল হোসেন মোল্লা বলেন, ভাঙনকূলে থাকা আমার অনেক স্বজনরা তাদের বাপ-দাদার বাড়ির চিহ্নটুকু রাখতে পারেননি। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ও সংসদ সদস্যকে অবগত করেছি। কিন্তু এখনো ভাঙন রোধে কোনো সুরাহা পাইনি।

নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার এবং অনেক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গ্যাস বহনকারী জাহাজগুলোকে দায়ী করে তিনি বলেন, জাহাজের গতি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তবে সুগন্ধা নদীর সরই অঞ্চলটি ভাঙন রোধে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসেন বলেন, নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত সরই এলাকা আমরা এরই মধ্যে পরিদর্শন করেছি। ওখানে আমাদের প্রাথমিক জরিপ করা হয়েছে। এরপর একটি ডিজাইন ডাটা প্রেরণ করব। ডিজাইন ডাটা পেলে ওখানে ডিপিপি কার্যক্রম শুরু করা হবে। ডিপিপি কার্যক্রম অনুমোদন পেলে আমরা ওখানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব।