ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাই প্রাধান্য পাবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। গতকাল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের সমাপনী দিনে বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
আগামী ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে বর্তমান গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে সাংবাদিকরা জানতে চান, চুক্তিটি নবায়ন করা হবে, নাকি নতুন কোনো চুক্তি করা হবে? জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য যা সবচেয়ে ভালো, তা নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
বাংলাদেশ-ভারত সংলাপের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’
দ্বিপক্ষীয় সংলাপ এগিয়ে চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রক্রিয়া রাতারাতি সম্পন্ন করা যায় না। হঠাৎ একটি তারিখ নির্ধারণ করেও এ ধরনের আলোচনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।’
নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ ধরনের কোনো সফর হলে তার তথ্য বাংলাদেশ থেকেই আসা উচিত; অন্য কোথাও থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নয়।’
এর আগে ‘লিডার ইন অ্যান এজ অব আনসার্টেইনটি’ শীর্ষক সেশনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করেই এগোতে হয়। এটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমাদের আদর্শ ও নীতিবোধে নিশ্চয়তা রয়েছে কিনা, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় পর জনগণের বিপুল ও অকুণ্ঠ ম্যান্ডেট নিয়ে একটি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী একটি গণতান্ত্রিক সরকার। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। তবে জনগণের প্রতি সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ সরকার হিসেবে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।’
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ভবিষ্যতে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখবে। প্রযুক্তির কারণে কত কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে, তা হয়তো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে সঠিক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও দেশের বিশাল জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
‘জাস্টিস, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন’ সেশনে ‘নিউ এজ’ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, ‘বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ইতিহাসের একটি অনিবার্য অংশ এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রগতির জন্য এ ধরনের সংঘাতের সমাধান করা জরুরি। তবে বড় ধরনের সংঘাতের জন্য দায়ী অপরাধীদের সঙ্গে সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, অপরাধীরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে এবং জবাবদিহিমূলক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঘটনা যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও অবাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সংঘাত এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের কোনোটিতেই দায়ী ব্যক্তিরা এখন পর্যন্ত তাদের অপরাধ স্বীকার করেনি। এর ফলে কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও এসব সংঘাত অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।’
এদিন বিভিন্ন সেশনে আরো বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে প্রমুখ।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। তিনদিনের সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এতে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেন।










