বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল জনসংখ্যা কাঠামোর দিকে প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার বর্তমানে ২ দশমিক শূন্য, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বা প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারের (২ দশমিক ১) নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রত্যেক নারী গড়ে যে কয়টি সন্তান নিচ্ছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মকে প্রতিস্থাপন করার হারের সামান্য নিচে। স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড পপুলেশন শীর্ষক ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা হ্রাসের ঝুঁকিও থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯৫ সালে দেশের মোট প্রজনন হার ছিল ৩ দশমিক ৫। ২০০৫ সালের দিকে এটি নেমে আসে প্রায় ২ দশমিক ৭-এ। ২০১৫ সালের পর থেকে এটি কমে এসে প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ১-এর মধ্যে স্থির হয়। ২০২২-২৪ সালে বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার হলো প্রায় ২ দশমিক শূন্য, যা প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারের (২ দশমিক ১) সামান্য নিচে।
এটি এক ধরনের ডেমোগ্রাফিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি দেশ ধীরে ধীরে উচ্চ প্রজনন হার থেকে নিম্নহারে চলে আসে। বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার আরো কিছু দেশ—যেমন নেপাল এ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশে মোট জন্মহার কমলেও কিশোরীদের মধ্যে মাতৃত্বের হার এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বাংলাদেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী প্রতি এক হাজার কিশোরী বা তরুণীর মধ্যে ৮০ জনেরও বেশি মা হচ্ছেন, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ কিশোরী প্রজনন হার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কিশোরী মাতৃত্বের হার আগামী বছরগুলোয় যদি দ্রুত কমে আসে, তবে মোট প্রজনন হার আরো কমে যাবে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো কোনো দেশে কিশোরী মাতৃত্ব কমলেও পরিণত বয়সে (২৫ বা তদূর্ধ্ব নারীদের মধ্যে) কিছুটা হারে সন্তান নেয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। একে বলা হয় ‘ফার্টিলিটি রিক্যুপারেশন’। অর্থাৎ প্রজনন হার তৎকালীনভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা পুরোপুরি নিম্নমুখী নাও থাকতে পারে।
ইউএনএফপিএ ১৪টি দেশের ১৪ হাজার মানুষের ওপর সন্তান নেয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জরিপ চালিয়েছে। পাঁচজনের মধ্যে একজন বলেছেন, তাদের কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক সন্তান হয়নি বা তারা সন্তানের আশাও করেননি। থাইল্যান্ড, হাঙ্গেরি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জার্মানি, সুইডেন, ব্রাজিল, মেক্সিকো, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় জরিপটি করা হয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এসব দেশে বসবাস করে। এর মধ্যে নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ—তিন ধরনের আয়ের দেশ রয়েছে। জরিপ করা হয়েছে তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রজননের সময়মীমা পেরিয়ে গেছে—এমন মানুষের মধ্যে।
ইউএনএফপিএর প্রধান নাতালিয়া কানেম বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে সন্তান জন্ম দেয়ার হার নজিরবিহীনভাবে কমে গেছে। জরিপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ মানুষ দুই বা ততোধিক সন্তান চান। কিন্তু তারা কাঙ্ক্ষিত পরিবার গড়তে পারছেন না। এটাই প্রকৃত সংকট।’
সব দেশ মিলিয়ে জরিপে অংশ নেয়া ৩৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতায় তারা কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় সন্তান নিতে পারেননি। এ হার সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ কোরিয়ায়, ৫৮ শতাংশ। সবচেয়ে কম সুইডেনে, ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় সন্তান না নিতে পারার পেছনে জন্মদানে অক্ষমতাকে দায়ী করেছেন ১২ শতাংশ মানুষ। একক দেশ হিসেবে এ হার কয়েকটি দেশে বেশি। যেমন থাইল্যান্ডে ১৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১৬, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৫, নাইজেরিয়ায় ১৪ ও ভারতে ১৩ শতাংশ। ইউএনএফপিএর হিসাবে, কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় সন্তান নিতে না পারার পেছনে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার চেয়েও বড় বাধা সময়ের অপর্যাপ্ততা।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের জন্য একটি সুষম জনসংখ্যা কাঠামো গঠনের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। এতে কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়, নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আবাসন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ও সামাজিক স্বীকৃতি—সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির জনসংখ্যাবিদ অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গিয়েটেল-বাস্তেন বলেন, ‘জাতিসংঘ প্রথমবারের মতো কম জন্মহারের বিষয়ে এত জোরালোভাবে কথা বলছে। এ সংস্থা এতদিন মূলত এমন নারীদের গুরুত্ব দিত, যাদের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সন্তান ছিল এবং যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করা দরকার।’
তবে ইউএনএফপিএ জন্মহারের বাড়া-কমা নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক নাটালিয়া বলেন, ‘আমরা এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, তা হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা বা জনসংখ্যা হ্রাস—দুটি নিয়েই অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, ৪০ বছর আগেও চীন, কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড ও তুরস্ক মনে করত তাদের জনসংখ্যা অতিরিক্ত। কিন্তু ২০১৫ সালের মধ্যে এসব দেশ প্রজনন হার বাড়াতে চেয়েছে।










