একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এসে ভিড়
জমাত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ে। শীতকাল এলেই পরিযায়ী পাখির কলতানে রীতিমতো
স্বর্গীয় রূপ নিত মনোমুগ্ধকর টাঙ্গুয়ার হাওড়। এসব পাখির সুরক্ষা নিশ্চিতে হাওড়ের
একাংশকে পাখির অভয়ারণ্য বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু হাওড়ের শীত মৌসুমের চিরাচরিত
দৃশ্যটিতেও পরিবর্তন আসছে এখন। টাঙ্গুয়ার হাওড়ে এখন আর এসে আগের মতো ভিড় জমায় না
পরিযায়ী পাখিরা। এমনকি অভয়ারণ্যেও পাখির দেখা মেলে আগের তুলনায় অনেক কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্যে
হাওড়ে আসা পাখিগুলোর এখন আর নির্ভয়ে বিচরণের সুযোগ নেই। এছাড়া প্রতিবেশগত সংকটে
সৃষ্ট খাদ্যাভাব ও দূষণের কারণেও হ্রাস পাচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওড়ে পরিযায়ী পাখির
বিচরণ।
স্থানীয়রা জানান, দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওড়ে প্রতি বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই এসে
ভিড় জমায় অসংখ্য পাখি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। এ
বছরও পাখি এসেছে অনেক কম। আগের মতো পরিযায়ী পাখির ব্যাপক বিচরণ না থাকায় হতাশ
হচ্ছেন হাওড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও। তার পরও থেমে নেই চোরাশিকারিরা। প্রতিদিনই
তাদের হাতে মারা পড়ছে পরিযায়ী পাখি।
হাওড়পাড়ের বাসিন্দা আবুল খায়ের বলেন, পাঁচ বছর আগেও পাখির কলতানে মুখরিত থাকত গোটা এলাকা। এখন আর আগের মতো এত পাখির
ডাক শোনা যায় না। এর মূল কারণ শিকারের ফলে হাওড়ে পরিযায়ী পাখির আগমন দিন দিন কমে
যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পাঁচ বছর পর হাওড়ে হয়তো আর পরিযায়ী পাখি দেখাই যাবে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাশিকারিরা রাতের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে বা ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করছেন।
হাওড়ের হাতিরগাতা, লৌয়ান বিল, রূপাবই, লেউচ্ছামারা, তেগুনিয়াসহ অর্ধশতাধিক স্থানে এভাবে নিয়মিত পাখি শিকার চলছে।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক)
সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওড়ের সার্বিক পরিস্থিতি এখানকার জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে
পড়েছে। এখানে পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য, বিচরণস্থল নষ্ট হওয়া ও খাবারের অভাবসহ নানা কারণে পরিযায়ী পাখি আসার সংখ্যা
দিন দিন কমছে। হাওড়ের প্রকৃতি, পরিবেশ ও
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে, একসময় হয়তো এখানে আর অতিথি পাখি আসবে না। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে।
স্থানীয় এবং পরিবেশ ও হাওড় উন্নয়ন সংস্থা সূত্রে
জানা যায়,
শীত মৌসুমে হাওড়ে আসা পরিযায়ী পাখির প্রজাতিগুলোর মধ্যে বালিহাঁস, বিদেশী পানকৌড়ি, সরালি, মৌলভিহাঁস, পিয়ারি, লেমজা, মেগিহাঁস, হালিম পাখি, সিংলাই, রামকুড়া, মুরাল, গাংচিল, জল কবুতর, কালি ডাহুক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ২১৯ প্রজাতির পাখি
শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে পরিযায়ী পাখি ছিল ৯৮ প্রজাতির।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাওড়ে আসা পরিযায়ী পাখির সংখ্যা অস্বাভাবিক রকমের কম। পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে
পরিচিত
‘হাতিরগাতা’ এলাকায়ও
আশানুরূপ পাখির দেখা মেলেনি। এছাড়া লৌয়ানবিল, রূপাবই, লেউচ্ছামারা, তেগুনিয়ায়ও দেখা গেছে একই অবস্থা।
পরিবেশ ও হাওড় উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক
পীযূষ পুরকায়স্থ টিটু বলেন, কয়েক বছর আগেও টাঙ্গুয়ার
হাওড়ে যে পরিমাণ পরিযায়ী পাখি আসত, এখন তার ১০ ভাগের ১ ভাগ আসে কিনা, সন্দেহ রয়েছে। ২০০০ সালের দিকেও হাওড়ে দুই শতাধিক প্রজাতির পাখির বিচরণ ছিল।
এখন দেখা মেলে সর্বোচ্চ ৫০ প্রজাতির। এর মূল কারণ হাওড়ের অসাধু শিকারি। তারা রাতের
আঁধারে আলো জ্বালিয়ে, ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে।
এছাড়া হাওড়ের হিজল-করচ গাছও কেটে নিয়ে যাচ্ছে
দুর্বৃত্তরা। মাছের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না পাখিরা।
তিনি আরো বলেন, পরিযায়ী পাখির আগমন মৌসুমের শুরুতেই পাখির নিরাপত্তার জন্য নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি এ কাজে নিয়োজিত জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে পাখিরা আগের মতো মুখ ফিরিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার শঙ্কা খুব বেশি।
শুধু পাখি শিকার নয়, এর পাশাপাশি হাওড়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকার কারণে ক্রমবর্ধমান শব্দদূষণকেও পাখির
আগমন কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করছেন অনেকে। বালিজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা বশির আহমদ বলেন, হাওড়ে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে জেলেরা মাছ ধরে থাকেন। এসব নৌকার ইঞ্জিনের
শব্দে পাখিরা ভয় পেয়ে চলে যায়।
সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তাহিরপুর
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জি বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওড়ে আগে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসত। এখানকার জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে
আনার জন্য হাওড়পাড়ের মানুষদের নিয়ে আমরা মতবিনিময় করছি। পরিযায়ী পাখি শিকার থেকে
বিরত রাখতে আমরা তাদের বোঝাচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করে যাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, আমরা টাঙ্গুয়ার হাওড়ের পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি।
আমাদের কিছু কমিউনিটি গার্ড আছে। তাদের মাধ্যমে পাখিনিধন রোধ করার জন্য চেষ্টা
করছি। এছাড়া ইঞ্জিনচালিত নৌকার দূষণ থেকে পাখিগুলো রক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছি।
টাঙ্গুয়ার হাওড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।









