বাসের সিটে বসা নিয়ে বাগিবতণ্ডার জের ধরে স্থানীয় জনগণ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের জের এখনো কাটেনি। গতকাল সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিক্ষোভ, প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা, উপাচার্যসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে রাখা এবং মহাসড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। রাত পৌনে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন এলাকা ও মূল ফটক থেকে সরে গিয়ে চারুকলা গেটের রেললাইনে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রেললাইনেই অবস্থান করছিলেন শিক্ষার্থীরা। এ অবরোধের কারণে রাজশাহীর সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া অন্য সব জেলার রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) অসীম কুমার তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চারুকলার সামনে রেলপথের দুই জায়গায় আগুন ধরিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকালও তাদের অবরোধের কারণে ধূমকেতু ট্রেনটি সাড়ে ৪ ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। আজ মধুমতি, সাগরদাঁড়িসহ অন্য যেসব ট্রেন রাজশাহী ঢুকবে তাদের ক্যাম্পাস এলাকার আগের স্টেশন হরিয়ান ও সরদহে থামার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই ট্রেন প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে, তার আগে নয়।’
অন্যদিকে শনিবার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার বিচারসহ আট দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অনশনে বসেছেন ১৫ শিক্ষার্থী। শুরুতে তিনজন শিক্ষার্থী অনশন শুরু করেন, পরে বাকিরা যোগ দেন। শনিবারের ঘটনার জন্য প্রক্টরের পদত্যাগ ও প্রশাসনের জবাবদিহি; বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ ও নির্দিষ্ট পাস কার্ডের মাধ্যমে প্রবেশ নিশ্চিত করা; আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় বহন; হামলাকারীদের চিহ্নিত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শাস্তির ব্যবস্থা; বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশা ভাড়া ও খাবার বিল নির্ধারণ; বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বহিরাগতদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ; রাজনৈতিক দখলদারত্ব ছাড়া শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত এবং শিক্ষার্থী ভোগান্তি কমাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলওয়ে স্টেশন আবার চালুর দাবিতে অনশনে বসেছেন এ শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অনশনরত হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী রাবিয়া জান্নাত রাইসা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দাবি নিরাপদ ক্যাম্পাস। গতকাল যে ঘটনা ঘটেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো পদক্ষেপই প্রশাসন নেয়নি। আমরা এর বিচার চাই। আমাদের দাবিগুলো অবিলম্বে প্রশাসনকে মেনে নিতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের অনশন চলবে।’
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান করছিলেন অনশনরত শিক্ষার্থীরা।
এর আগে শিক্ষার্থীদের ওপর স্থানীয়দের হামলা, পুলিশের গুলির বিচার দাবিতে গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। শুরুতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনের সামনে জড়ো হন তারা। এরপর প্রশাসন ভবনের মূল ফটকে তালা দিয়ে প্রত্যেকটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের জড়ো করতে পদযাত্রা শুরু করেন। এ সময় তারা প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধরের শিকার হন দুই গণমাধ্যমকর্মী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপাচার্যের বাসভবনের সামনে সংবাদ সংগ্রহের সময় চ্যানেল২৪-এর ক্যামেরাপারসন জুয়েলকে ধাওয়া দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে ও চ্যানেল২৪-এর সাংবাদিক আবরার শাঈরকে মারধর করা হয়। ভাংচুর করা হয় ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। কালের কণ্ঠের ফটো সাংবাদিক সালাহউদ্দিনের ক্যামেরাও ভাংচুর করা হয়।
এরপর দুপুর সাড়ে ১২টায় সরাসরি আলোচনার জন্য শিক্ষার্থীদের সাবাস বাংলাদেশ মাঠে যাওয়ার আহ্বান করেন উপাচার্য। কিন্তু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিনোদপুরে উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনার দাবি জানান। শিক্ষার্থীদের দাবি, যেখানে শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরেছে সেই বিনোদপুরে আলোচনায় বসতে হবে। তারা মিছিল নিয়ে বিনোদপুরে যেতে চান। সঙ্গে উপাচার্যকেও যেতে হবে। তাতে সম্মতি না দেয়ায় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবীরকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে শাখা ছাত্রলীগের প্রটোকলে উপাচার্যসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা উপাচার্যের বাসভবনে চলে যান। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থদের আলোচনায় মামলার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর গতকাল বিকালে শনিবারের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করে নগরীর মতিহার থানায় মামলা দায়ের করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে বাদী হয়েছেন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম। সন্ধ্যায় জনসংযোগ প্রশাসক অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমারের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মামলার বিষয়টি জানানো হয়।
মামলার পর বিকালেই তসলিম আলী ওরফে পিটার (৪৫) নামে একজনকে গ্রেফতার করে মতিহার থানা পুলিশ। মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আটককৃত পিটার বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারের বাসের চেইন মাস্টার। তার বাড়ি নগরীর খোজাপুর এলাকায়। মামলা হওয়ার পর বিনোদপুর থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংঘর্ষে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হবে।’









