মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাত তীব্রতর হচ্ছে। রাখাইন ও এর আশপাশের অঞ্চলে মার্চে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ তহবিল এসেছে। আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট, চর্ম ও পানিবাহিত রোগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় বিপন্ন জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আবারো আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাসংক্রান্ত সংস্থার (ওসিএইচএ) মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তবতী পোন্নাগিউন ও সিত্তে এলাকা এবং কিয়াকফিউ টাউনশিপে চলমান লড়াইয়ে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক।
গত নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত রাখাইন ও চিনের পালেতওয়া এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বর-পরবর্তী সময়ে রাখাইনে মোট বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজারে। সংঘাত এখন ছড়িয়ে পড়ছে রাখাইনের বাইরেও—আয়ারওয়াদি, বাগো ও ম্যাগওয়ে অঞ্চলে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে কিয়াকফিউ এলাকায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের কারণে প্রায় দুই হাজার মানুষ বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। পকতাউ ও রাথেডং এলাকায় গোলাবর্ষণের শিকার হয়ে হাজারো মানুষ পোন্নাগিউনে আশ্রয় নিয়েছে। কিয়াকফিউ ও সিত্তে এলাকায় প্রায় ১০ হাজার নতুন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা আরো বেশি। কারণ চলাচলে নিষেধাজ্ঞায় অনেকেই এখনো নিরাপদ স্থানে যেতে পারেনি। গত ২৮ মার্চের ভূমিকম্পের কারণে দেশটির সরকার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও দুদিনের মাথায় তা লঙ্ঘন করে বিমান হামলা জোরদার করে।
নতুন করে বিপুল পরিমাণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেও দেশটিতে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক সাহায্য। ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে মিয়ানমারের জন্য মানবিক সহায়তার পরিকল্পনার মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ তহবিল এসেছে। ফলে স্থানীয় সংগঠনগুলোর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। অধিকাংশ কর্মী চাকরি হারিয়েছে। খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দুই লাখেরও বেশি মানুষ। এরই মধ্যে রাখাইনে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পোন্নাগিউন টাউনশিপের প্রায় ৬০টি গ্রামে বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। একই অবস্থা মাইবন ও পাকতাউ এলাকায়ও। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতার কারণে চলতি বছরের শুরু থেকে রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১০টিতে চার হাজারেরও বেশি মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংঘাতের ফলে নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য, পানীয় ও চিকিৎসা সংকটের কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে শরণার্থীর চাপ তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইন সীমান্তবর্তী চিন, ম্যাগওয়ে ও সাগাইং অঞ্চলে বিমান, ড্রোন ও মাইন হামলা জোরদার করেছে মিয়ানমার আর্মি। অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের একাধিক খবর মিলেছে। মান্দালয়ে ১০ মার্চ থেকে তীব্র সংঘাত ও বিমান হামলার কারণে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ রাখাইন হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে পারে।
প্রসঙ্গত, প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের ১৫টির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যার মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তও রয়েছে। এসব অঞ্চলে আরাকান আর্মি তাদের আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গভর্নমেন্টের মাধ্যমে রাজ্যের বিচার বিভাগ থেকে জনস্বাস্থ্য পর্যন্ত সব কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি বদল দিয়েছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও বঙ্গোপসাগরের পাশে কৌশলগত অবস্থানের জন্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে রাখাইন। এছাড়া এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ ও ভারতের বেশকিছু ইস্যু। ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট (পুবে চলো) নীতিমালায় পালেতওয়া ও সিত্তের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলত এ দুই শহরকে কেন্দ্র করেই ভারতের অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে উচ্চাভিলাষী কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট। আরাকান আর্মির উত্থান প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে ভারতকে। নয়াদিল্লি এরই মধ্যে এ বিষয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ডি ফ্যাক্টো হয়ে উঠেছে আরাকান আর্মি। কক্সবাজারে ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরাতে আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা অপরিহার্য বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।










