ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কিত শেয়ারে বড় দরপতনের মাঝেও এশিয়ার শেয়ারবাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি করলেও অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন তুলনামূলক নিরাপদ ও প্রতিরক্ষামূলক খাতে। এর বিপরীতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অধিকাংশ শেয়ারবাজারে গত শুক্রবার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নীতিগত প্রত্যাশা, করপোরেট ফলাফল ও আঞ্চলিক বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদি কৌশলের কারণে ওয়াল স্ট্রিটের নেতিবাচক প্রবণতা এশিয়ার শেয়ারবাজারে সরাসরি প্রতিফলিত হয়নি। খবর রয়টার্স ও এপি।

সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ কার্যদিবস শুক্রবারে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক কম্পোজিট সূচক একদিনে কমেছে ১ শতাংশের বেশি। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজও পতনের মধ্য দিয়ে দিন শেষ করে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এআই খাতে অতিমূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) কয়েকজন নীতিনির্ধারক সাম্প্রতিক সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি। তাদের এ বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের রিটার্ন বেড়ে যায়, যা শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী গতি দুর্বল করে দেয়।

প্রযুক্তি খাতের কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা জোরালো হয়েছে। চিপ নির্মাতা ব্রডকমের ভবিষ্যতে মুনাফা মার্জিন কমতে পারে বলে সতর্ক করার পর একদিনে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমে যায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। এআই অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগকারী ওরাকলের শেয়ারদর আগের দিনের প্রায় ১১ শতাংশ পতনের ধারাবাহিকতায় আরো কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

ওপেনএআইয়ের জন্য নির্মিত ডাটা সেন্টার প্রকল্প বিলম্বিত হচ্ছে, এমন একটি প্রতিবেদন প্রতিষ্ঠানটি অস্বীকার করলেও শেয়ারদরের নিম্নমুখী ধারা থামেনি। একই দিনে এআই চিপ প্রস্তুতকারী এনভিডিয়ার শেয়ারদরও কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি করে তুলনামূলক নিরাপদ ও প্রতিরক্ষামূলক খাতে ঝুঁকেছেন।

তবে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ছিল ভিন্ন চিত্র। ওয়াল স্ট্রিটের আগের দিনের রেকর্ডমুখী অবস্থানের ধারাবাহিকতায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অধিকাংশ প্রধান শেয়ার সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক আগের দিনের পতন কাটিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৫০ হাজার ৮৩৬ পয়েন্টে।

বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক অব জাপানের আসন্ন নীতিনির্ধারণী বৈঠকের দিকে নজর রাখলেও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদরের উত্থান সামগ্রিক শেয়ার সূচককে সহায়তা করে। একই দিনে সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

চীনের শেয়ারবাজারেও গত শুক্রবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং শেয়ার সূচক দিন শেষে বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। একই দিনে চীনের মূল ভূখণ্ডের সাংহাই কম্পোজিট শেয়ার সূচকও দশমিক ৪ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা সম্মেলনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ভোগ জোরদারের অঙ্গীকার বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও সম্মেলন থেকে বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা আসেনি, তবু আগামী দিনের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়ায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কিছুটা বেড়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি শেয়ার সূচক গত শুক্রবার বেড়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। একই দিনে তাইওয়ানের তাইএক্স শেয়ার সূচক ও ভারতের বিএসই সেনসেক্স শেয়ার সূচকও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারে এসঅ্যান্ডপি এএসএক্স ২০০ সূচক দিন শেষে ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ার পর স্থির হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর বাড়ায় সামগ্রিক শেয়ার সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার শেয়ারবাজার আপাতত ওয়াল স্ট্রিটের নেতিবাচক প্রবণতার সরাসরি প্রভাব এড়িয়ে চলতে পারছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক পতন মূলত এআই ও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদর কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এশিয়ার অনেক শেয়ারবাজারে খাতভিত্তিক বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এর প্রভাব সীমিত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের নীতিনির্ধারণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তুলনামূলক ইতিবাচক। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার কিছু শেয়ারবাজারে শেয়ারের মূল্যায়ন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম থাকায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বজায় রয়েছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত মুনাফা এনে দেবে কিনা তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওরাকলের শেয়ারদরে বড় পতন বিনিয়োগকারীদের সে আশঙ্কাই মনে করিয়ে দিয়েছে। এতে অনেকের কাছে ২০০০ সালের ডটকম বাবলের স্মৃতি ফিরে এসেছে। সে সময় প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানির শেয়ারদর দ্রুত বাড়ার পর হঠাৎ বড় ধস নামে বাজারে।

এছাড়া এনভিডিয়ার মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়াও বিনিয়োগকারীদের আরো সতর্ক করেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার ও মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ হলে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের দিকনির্দেশনা নতুন করে নির্ধারণ হতে পারে।