বিগত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব পর্যালোচনা করে বেশকিছু গরমিল পাওয়া গেছে। ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে এসব অসংগতি চিহ্নিত করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি, যা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মিলনায়তনে গতকাল এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে এ তথ্য উঠে আসে। ‘জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক।
অনুষ্ঠানে জিডিপির ফরেনসিক অডিট প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু বলেন, ‘আমরা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি, তা বিগত সরকারের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার জন্য নয়। বরং সমস্যার গভীরে যেতে না পারলে তা সমাধান করা সম্ভব নয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগের গভীরে যেতে হবে। সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে হবে। সেখান থেকে শুরু করলেই আমরা দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করতে পারব। এর বাইরে নতুন করে কিছু আবিষ্কারেরও প্রয়োজন নেই। মূল বিষয় হচ্ছে ডেটা (তথ্য)। যার কাছে সঠিক ডেটা থাকবে, সে সেই ডেটার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে পারবে।’
বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তুলে ধরতে বিবিএসের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে—উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তথ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো সরকারের পক্ষে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তথ্য একটি সরকারের হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যে সরকারের হাতে তথ্য থাকবে না, তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সে তথ্যের ওপর আস্থা না থাকলে কাজ করা সম্ভব নয়। যে তথ্য পরিমাপযোগ্য নয় ও যার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তার ওপর কারো আস্থা থাকার কারণ নেই। কোনো সরকার তথ্য নিয়ে কারসাজি করলে তা নিজের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’ এ অবস্থা থেকে বের হতে বিবিএসকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হবে, সে লক্ষ্যেই সরকার এগিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে তৈরি তথ্য অনেক শক্তিশালী। সঠিক পরিসংখ্যান দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিসংখ্যানকে উন্নয়নের বয়ান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংখ্যা একসময় ১৩ হাজার দেখানো হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬৭ হাজার। এ ধরনের তথ্যের ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, অতীতে কীভাবে পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।’
সরকার তিনটি প্রধান সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় সরকার তিনটি প্রধান সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে মানসম্পন্ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিসংখ্যান তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, জননীতি প্রণয়ন ও সরকারি সেবা বাস্তবায়নে সঠিক তথ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষ, গবেষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিসংখ্যান সহজলভ্য করা।’
পরিসংখ্যান ও তথ্য নিয়ে মানুষের অবিশ্বাস ও অনাস্থা অনেক দিনের বলে মন্তব্য করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রথম কাজ তথ্য-উপাত্তে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। অতীতের ফ্যাসিবাদী আমলে পরিসংখ্যান নিয়ে যা হয়েছে, তার ফলে মানুষের মধ্যে এর প্রতি আস্থা নেই। এখন যথাযথ তথ্য দিলেও তা বিশ্বাস করতে চায় না। তাই আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ফরেনসিক অডিটের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বিগত দিনগুলোয় জিডিপি যেভাবে হিসাব করা হতো, তার মধ্যে ফাঁকফোকর কিংবা জিডিপি প্রকৃত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন আমাদের প্রমাণসহ বিষয়গুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সহযোগিতায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গবেষণা কেন্দ্র এবং বিবিএস যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে। এতে দেখা গেছে, জিডিপি যেভাবে নিরূপণ করা হয়েছে, তার মধ্যে যথেষ্ট গলদ রয়েছে। আমরা তা জনসম্মুখে তুলে ধরতে কাজ করছি।’ বর্তমান সরকার কোনোভাবেই তথ্যের বিকৃতি চায় না বলেও দাবি করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন বিবিএসের পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন এবং বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।










