বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলো চলতি বছর থেকে সুদহার কমাতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকটাই শিথিল হয়ে আসায় এসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনছে। ফলে বাড়ছে বিশ্বজুড়ে লেনদেন হওয়া সব ধরনের পণ্যের চাহিদা। এ ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছিল আন্তর্জাতিক বাজার। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
বাজার বিশ্লেষকরা জানান, সুদহারের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও সরবরাহসংক্রান্ত উদ্বেগেও পণ্যের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে। অর্থনীতিতে টানাপড়েন চললেও চীনে আগামী মাসগুলোয় চাহিদা লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
ধাতব পণ্য
চীনের গৃহস্থালিগুলোয় সম্প্রতি স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে মূল্যবান ধাতুটির বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মার্চে কনজিউমার কনফিডেন্স ইনডেক্স দশমিক ১ শতাংশ কমে ১০৪ দশমিক ৭ পয়েন্টে নেমেছে। এ সূচকে পতন অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও। এসব বিষয়ও স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে রসদ জোগাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত সপ্তাহে স্বর্ণের দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি আউন্সের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৩৩ ডলারে, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ। এছাড়া অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মধ্যে রুপার দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ, প্যালাডিয়ামের দাম ৩ ও প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
বহুমুখী চ্যালেঞ্জের কারণে তামা উত্তোলন বন্ধ করে দিচ্ছে খনিগুলো। এতে ধাতুটির সরবরাহ উদ্বেগের মুখে। এ কারণে লাফিয়ে বাড়ছে দাম। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়ামের শীর্ষ উৎপাদক চীনে সম্প্রতি বাধার মুখে পড়েছে ধাতুটির উৎপাদন। ইউনান প্রদেশে শুষ্ক আবহাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ কারণে ঊর্ধ্বমুখী চাপে পড়েছে ধাতুটির বাজার।
বিশ্লেষকরা জানান, আগামী দুই মাস ইউনান প্রদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হবে। ফলে পরিকল্পিত উৎপাদন লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে বিগলন কেন্দ্রগুলো।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত সপ্তাহে তামার দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় দশমিক ৩ শতাংশ, অ্যালুমিনিয়ামের দাম ১ দশমিক ১ ও সিসার দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে দস্তার দাম ১ দশমিক ৮ ও নিকেলের ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।
জ্বালানি পণ্য
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তার ওপর ওপেক প্লাসের সদস্যরা বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরবরাহ সংকুচিত করছে। বছরের বাকি সময়জুড়ে জোটটি উত্তোলন কমাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
লোহিত সাগরে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোয় আরো ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে জ্বালানিটির সরবরাহ আরো ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এতে দাম আরো বাড়বে। অন্যদিকে মজুদ কমে যাওয়ার প্রভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম গত সপ্তাহে ২ শতাংশ বেড়েছে। নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে (নিমেক্স) এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
খাদ্যশস্য
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গম উৎপাদক। সেখানে শস্যটির মজুদ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত সপ্তাহে দাম বেড়েছে। শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে এক সপ্তাহের ব্যবধানে গমের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া ভুট্টার দাম দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে চালের দাম ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে গেছে। যদিও সয়াবিনের দাম আগের সপ্তাহের মতোই অপরিবর্তিত ছিল।
অন্যান্য পণ্য
ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিনি উৎপাদক। এ বছর দেশটিতে পণ্যটির উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঘাটতি বাড়বে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ কারণে চিনির দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ভিয়েতনাম থেকে রফতানি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বেড়েছে কফির দাম।
এদিকে বিশ্ববাজারে কোকোর দাম বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। আইভরি কোস্ট ও ঘানা নেতৃস্থানীয় কোকো উৎপাদক। দেশ দুটির বেশির ভাগ মিল কোকো উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়ায় বাজারদরে এমন উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হওয়া কোকোর ৪৫ শতাংশই আসে আইভরি কোস্ট থেকে। সেখানে এ বছর এটির উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জে গত সপ্তাহে চিনির দাম দশমিক ৩ শতাংশ, কফির দাম ২ ও কোকোর দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে তুলার দাম দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।










