নীল চাষ ঔপনিবেশিক বাংলা তথা ভারতের গর্ব ও দ্রোহের ইতিহাস। একসময় ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল ভারতীয় নীল। তবে সময়ের সাথে সাথে আবেদন হারায় তা। প্রজন্মান্তরে নীলের সে হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসছে মাদ্রাজে। বণিক বার্তায় তিন পর্বে নীলের ঐতিহ্য, বিদ্রোহকাল ও বর্তমান অগ্রযাত্রার সলুক সন্ধান করেছেন সৈয়দ রাইয়ান আমীর

উপনিবেশ আমলের ভারতীয় ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে নীলের নাম। আগের দুই পর্বে এ অঞ্চলের নীল সূচনা, অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য হয়ে ওঠা, গুণে ও মানে সেরা হওয়ায় ইউরোপের বাজারে তুমুল চাহিদা, কৃষক আন্দোলন, একপর্যায়ে বাংলা তথা উপমহাদেশ থেকে পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ পর্বে হারানো ঐতিহ্যের স্বরূপে ফেরার প্রচেষ্টার প্রতি আলোকপাত করা হবে।


নীলের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসছে। তবে সেটা বাংলায় নয়, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে। এ রাজ্যের কোনগারাপাত্তুতে চার প্রজন্মের নীলচাষীদের দেখা মেলে এখনো। বছরে তিনবার ফসল হলেও এ বছর করোনার কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো ঐতিহ্যবাহী ‘ঠোঁতটি পোদুরাঠু’ বা নির্যাস সংগ্রহের প্রথম দিন বিপুল উৎসাহের সাথে পালন করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ ভারতীয় নীলচাষীরা মনে করেন, এ নীলের বেশকিছু ভেষজ গুণাগুণও রয়েছে।

১৯৬০-এর দশক থেকে নীল ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে বালাচন্দর আনভাঝাগন। তার মতে, এটি তাদের জন্য এক মহোৎসব। নীল গাছের পাতা থেকে নীল বের করার সময় তিনি দেখেছেন তার দাদি বিশেষ প্রার্থনা করতেন। তিনি বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে আমরা কাজকে প্রার্থনা হিসেবে কল্পনা করি। এখনো নীল চাষের জন্য পুরনো পদ্ধতি ব্যবহার করি। এমনকি এর নির্যাস তৈরির প্রক্রিয়াও শতাব্দী প্রাচীন, বিস্তৃত ও জটিল।


গবেষক ক্যাথেরিন গিলনের মতে এখানে, দক্ষিণ ভারতে নীল একজন দেবী হিসেবে বিবেচিত হন। বস্তুত কালী ও কৃষ্ণের মতো অনেক হিন্দু দেবতাকে প্রায়ই নীল রঙে চিত্রিত করা হয়। তাই মহাবিশ্বের রঙের প্রতীক নীল।

তার মতে, চাষের শুরুটা ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে জোর করে হলেও এখন এ ‘নীল সোনা’ এ অঞ্চলের স্বতন্ত্র পরিচয়ের সাথে সাথে ঐতিহ্যও বহন করে। যদিও উপনিবেশ আমলেই মাদ্রাজ থেকে নীল চাষের প্রচলন হারিয়ে যায়। তবে হারানো সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এখনকার প্রজন্ম। পরিবেশসচেতনতা থেকে মানুষের কাছে প্রাকৃতিক ডাইয়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হারানো নীলের নতুন সুুলুকসন্ধান শুরু হয়েছে।

৩৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ আইয়ুব উপকূলীয় ভিল্লুপুরাম জেলার কোনগারাপাত্তু থেকে চার কিলোমিটার দূরে ভেঙ্গান্দুরে নীল তৈরিতে তার পরিবারের উত্তরাধিকার পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি কিছু বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, যার মাঝে দক্ষ লোকবলের অভাব অন্যতম। তিনি বলেন, তার প্রপিতামহ প্রতিবেশী রাজ্য কর্ণাটকের মহীশূরের ১৮ শতকের শাসক টিপু সুলতানের আদালতে কাজ করতেন। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর আইয়ুবের পরিবার ভেলোর জেলায় স্থানান্তরিত হন এবং ১৮৩০-এর দশকে ভেঙ্গান্দুরে বসতি স্থাপন করেন। ওই সময় জনপ্রিয় হওয়ায় তাদের পরিবার নীল চাষে সম্পৃক্ত হয়, যা এখনো চলছে। তবে আগের সেই জৌলুশ আর নেই।


নীলের অতীত-বর্তমান নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী বলেন, নীল ইংল্যান্ডের বস্ত্র শিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান ডাইয়ের উৎস ছিল। শিল্প বিপ্লবের বিকাশকালে এটি বাংলা ও বিহারের মতো উত্তর ভারতের কয়েকটি রাজ্যে চাষ হতে শুরু করে। স্থানীয় কৃষকরা শস্যের বদলে নীল চাষে বাধ্য হন। এতে তখনকার জমিদারি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক রফতানি পণ্য হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাসের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক একক হয়ে আছে নীল।

তিনি আরো বলেন, নীলকরদের একচেটিয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলার প্রথম গণজাগরণে কৃষকরা নিপীড়নকারীদের আদালতে নিয়ে যায় এবং নিজেদের পক্ষে একটি যুগান্তকারী রায় লাভ করে। বহু বছর পর বিহারের কৃষকরা নিপীড়নমূলক তিনকাথিয়া ব্যবস্থার অধীনে চলে যান। যেখানে একটি কৃষিজমির ২০ ভাগের ৩ অংশে নীল বা ইন্ডিগো বাধ্যতামূলকভাবে চাষ করতে হয়। জার্মানিতে ১৮৭৮ সালে রাসায়নিক রঙ আবিষ্কারের সাথে সাথে নীলের বাজার ধসে পড়ে এবং বিহারের কৃষকদের পরিস্থিতি আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে।

১৯১৭ সালে মহাত্মা গান্ধী চম্পারণ পরিদর্শন ও নীলচাষীদের বিষয়গুলো নথিভুক্ত করতে আসেন। এটি তার প্রথম অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনে প্রভাব ফেলে। তুষার গান্ধী আরো বলেন, আমি বিশ্বাস করি গান্ধী আইনি ন্যায়বিচারের দাবিতে বাংলার অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে তার কৌশল তৈরি করেছেন। সে সময় সবচেয়ে বড় নিপীড়ন ছিল কৃষকদের বিরুদ্ধে।

১৭৭৭ সালে বাংলায় নীল চাষ শুরু হয়। ওই সময় ইংরেজরা নীল চাষে প্রচুর ঋণ দিত। তবে একবার কৃষকরা ঋণ নিলে, তারা সুদের উচ্চহারের কারণে তা পরিশোধ করতে পারত না। কর হারও অতিরিক্ত ছিল। কৃষকদের নির্মমভাবে নিপীড়ন করা হতো, যদি তারা ঋণ পরিশোধ করতে না পারত, সাথে ছিল চাষে অস্বীকৃতি জানানোর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা। তারা ইউরোপীয় প্লান্টারদের মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য অলাভজনক হারে নীল বিক্রি করতে বাধ্য হতো। তখনকার উপনিবেশিক প্রশাসন ছিল এ নিয়মের সহায়ক।

ইয়েলাপা, জগদ্দা রাজাপ্পা ও সিরিজা লারাওনার মতো ব্যক্তিরা, যারা নীল চাষের সাথে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে মিশে আছেন, মনে করেন যে ইন্ডিগো চাষের পুনরুজ্জীবন ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় এর বিস্তার পুদুচেরি থেকে রাজস্থান হয়ে বাংলা অবধি বেশ চমকপ্রদ। প্রাকৃতিক নীল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার এমন প্রচেষ্টা কৃত্রিম নীল দ্বারা প্লাবিত বিশ্ববাজারে একটি বিশেষ স্থান এনে দেবে বললেও ভুল হবে না। যদিও নীলের রক্তাক্ত ইতিহাস ভুলে শুধু লাভের প্রত্যাশায় গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসালে শেকড়বিহীন গাছে পরিণত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

 

ছবি: আল জাজিরা