কাজুবাদাম উৎপাদনে ভিয়েতনাম বিশ্বের শীর্ষ দেশ। একই সঙ্গে প্রতি বছর কৃষিপণ্যটির রফতানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশটি। প্রক্রিয়াকরণ শিল্প বেশ উন্নত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে ভিয়েতনামিজ কাজুবাদামের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। সঠিক পরিকল্পনা ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাজুবাদাম শিল্পে দ্রুত উন্নতি করেছে দেশটি। অবস্থান পোক্ত করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
যাত্রা বেশি দিনের নয়। মাত্র তিন দশকের মধ্যে কাজুবাদাম রফতানি করে আয় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে ভিয়েতনাম। অল্প পরিমাণ কাঁচা কাজুবাদাম রফতানি দিয়ে শুরু করা ভিয়েতনাম ১৫ বছরের মধ্যে পণ্যটির অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৯০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে কাজুবাদাম রফতানি করছে দেশটি।
দেশটির কাজুবাদাম শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সংগঠন ভিয়েতনাম ক্যাশু অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ফাম ভেন কন জানান, ১৯৯০ সালে সংগঠনটি গঠিত হয়। শুরুতে ১২ উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক এর সদস্য হলেও ৩০ বছরের ব্যবধানে সদস্য সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দেশে-বিদেশে অবস্থান পোক্ত করেছে ভিয়েতনামের কাজুবাদাম শিল্প।
কাজুবাদামের বৈশ্বিক বাজার বিস্তারে প্রভাবক ছিল পণ্যটির উৎপাদনের টানা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। গত বছর বিশ্বজুড়ে ৫৪ লাখ টন কাজুবাদাম উৎপাদন হয়েছে। এ পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ২০১৩-১৯ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে কাজুবাদাম উৎপাদন বেড়েছে।
প্রবৃদ্ধির এ ধারায় ভিয়েতনামের ভূমিকা কম নয়। বিশ্বের বুকে ভিয়েতনামে সবচেয়ে বেশি কাজুবাদাম উৎপাদন হয়। গত বছর দেশটিতে ১৫ লাখ টন কাজুবাদাম উৎপাদন হয়েছে। ৮ লাখ ৩ হাজার টন উৎপাদন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভারত। আর ৭ লাখ ৪৭ হাজার টন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আইভরি কোস্ট। এ তিন দেশের দখলে ছিল বৈশ্বিক উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ কাজুবাদাম।
এ বিষয়ে ফাম ভেন কন বলেন, মাত্র তিন দশকের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ কাজুবাদাম উৎপাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ভিয়েতনাম। এর পেছনে ভূমিকা ছিল ভিয়েতনাম সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন। সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই কাজুবাদাম উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক নীতিমালা করা হয়েছে। প্রণোদনা দেয়া হয়েছে চাষীদের। স্বল্পমূল্যে বীজ, চারা, কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। বাজার ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা হয়েছে। এসব কারণে ভিয়েতনামে কাজুবাদাম উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি কাজুবাদাম ব্যবহারেও আধিপত্য ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। গত বছর কাজুবাদাম ব্যবহারে শীর্ষ দেশ ছিল ভিয়েতনাম। দেশটি ২২ লাখ টন কাজুবাদাম ব্যবহার করেছে। এরপর ১৫ লাখ টন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত ও ২ লাখ ৪৩ হাজার টন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ফিলিপাইন। শীর্ষ এ তিন দেশ সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক উৎপাদনের ৭৪ শতাংশ কাজুবাদাম ব্যবহার করে। মালি, গিনি-বিসাউ, বেনিন, ব্রাজিল, আইভরি কোস্ট, মোজাম্বিক ও ইন্দোনেশিয়া মিলে আরো ১৮ শতাংশ ব্যবহার করে। বাকিটা অন্যান্য দেশের দখলে।
বিশ্বজুড়ে কাজুবাদামের বাজার দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। গত বছর এর আকার ছিল ১ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের ওপর ভর করে এ বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম। দেশটি নিজস্ব উৎপাদনের পাশাপাশি আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাজুবাদাম আমদানি করে। কাঁচা অবস্থায় আমদানি করা এসব কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত করার পর ফের রফতানি করে ভিয়েতনাম। এর জের ধরে কাজুবাদাম রফতানিতে দ্রুত উন্নতি করেছে দেশটি।
মানবদেহের জন্য উপকারী গুণাগুণসমৃদ্ধ কাজুবাদাম প্রক্রিয়াকরণের দুটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হলো ভিয়েতনাম ও ভারত। গত বছর ভিয়েতনাম ও ভারত যথাক্রমে ৭২ কোটি ২০ লাখ ও ১১০ কোটি ডলার মূল্যের কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করেছিল। কাজুবাদামের মোট আমদানির ৯৬ শতাংশই দেশ দুটির দখলে। এরপর দেশ দুটি থেকে রোস্টেড ও আনরোস্টেড অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে কাজুবাদাম রফতানি করা হয়েছে।
ভিয়েতনামে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও বাজার উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারীর মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) কাঁচা কাজুবাদাম রফতানি ৪ লাখ ১৫ হাজার টনে উন্নীত করেছে দেশটি।
এ বিষয়ে ফাম ভেন কন বলেন, কাঁচা কাজুবাদাম রফতানির পাশাপাশি পণ্যটির প্রক্রিয়াজাত শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এ খাতে ভিয়েতনামকে অন্যদের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া কাজুবাদাম শিল্পে দ্রুত বৈশ্বিক জায়ান্টে পরিণত হওয়া সম্ভব হতো না।
কাজুবাদাম নিয়ে সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো পণ্যটির মাথাপিছু ব্যবহার নিয়ে। গত বছর মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি কাজুবাদাম ব্যবহার করেছে গিনি-বিসাউ। এ সময় দেশটির মানুষ গড়ে ৮১ কেজি কাজুবাদাম ব্যবহার করেছে। এরপর মাথাপিছু ২৩ কেজি ব্যবহার করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম।
এছাড়া জনপ্রতি ১৩ কেজি কাজুবাদাম ব্যবহার করে পণ্যটির ব্যবহারকারীদের শীর্ষ তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বেনিন। আর মাথাপিছু কাজুবাদাম ৯ দশমিক ৮৮ কেজি ব্যবহার করে চতুর্থ অবস্থানে আছে মালি। যদিও ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে বার্ষিক মাথাপিছু কাজুবাদামের ব্যবহার ছিল গড়ে শূন্য দশমিক ৬৯ কেজি।
চলতি বছর করোনা মহামারী কাজুবাদাম শিল্পের অনেক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। পণ্যটির ব্যবহারে বড় ধরনের পতনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মহামারীজনিত কারণে বিশ্বজুড়ে সেবা খাত স্থবির হয়ে যাওয়া, দেশে দেশে ভোক্তার আয় হ্রাস এবং পণ্যটির আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় এ বছর কাজুবাদামের ব্যবহার সংকোচনের মুখোমুখি হয়েছে।
মহামারীর প্রভাবগুলো ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজুবাদামের বাজারও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০১৯-৩০ সময়ে এ বাজারের আকার ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বছরে ৬২ লাখ টন কাজুবাদাম বেচাকেনা হতে পারে।
ফাম ভেন কন বলেন, অন্যান্য দেশের মতো ভিয়েতনামের অর্থনীতিতেও মহামারীর ধাক্কা লেগেছে। চ্যালেঞ্জ এড়াতে পারেনি কাজুবাদাম শিল্প। লকডাউনে প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলো টানা বন্ধ ছিল। শ্লথ হয়ে এসেছিল উৎপাদন ও আমদানি রফতানি কার্যক্রম। অনেক কারখানা টিকে থাকতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পথে গেছে, যা পুরো শিল্পের ওপর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করছেন ভিয়েতনামের কাজুবাদাম শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তরা।
গ্লোবাল ট্রেড ম্যাগ, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও এগ্রিমানি অবলম্বনে










