ব্রিকস সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ইরান ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোর অর্থনীতিতে। পরিবর্তন আসবে ইথিওপিয়া ও মিসরের। তবে সার্বিকভাবে ব্লকের সদস্যদের জন্য অর্থনৈতিক প্রাপ্তি নিয়ে সন্দিহান বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকরা। নতুন বাজারের সংযুক্তি, জ্বালানি তেলের বাণিজ্যিক সুবিধা কিংবা ডলারের বিপরীতে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা সফল, তা নিয়ে দ্বিধা দূর হয়নি। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ব্রিকস সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
ব্রিকসের সদস্যদেশগুলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। চলতি বছরে নতুন করে যুক্ত হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া, ইরান, আর্জেন্টিনা ও মিসর। জোহানেসবার্গের সম্মেলন থেকেই তাদের সদস্যপদের অনুমোদন দেয়া হয়। ব্রিকসের সিদ্ধান্তটি বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিশালী অর্থনীতি বলয়ের বাইরে নতুন মেরু তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তবে যুক্ত হওয়া নতুন সদস্যদের পরিস্থিতি এক রকম নয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মূলত জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ। মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে জর্জরিত আর্জেন্টিনা বৈদেশিক বিনিয়োগ পেতে মরিয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় একঘরে হয়ে আছে ইরান। ইথিওপিয়া গৃহযুদ্ধ কাটিয়ে উঠতে ব্যস্ত আর মিসর এখনো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে খাবি খাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিবিদরা সন্দিহান হয়ে আছেন, ব্লকের সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বিদেশী বিনিয়োগ আদতে বাড়বে কিনা। অ্যাসেট ম্যানেজার এবিআরডিএনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিক্টর সাবো দাবি করেছেন, ‘মিসর আগে থেকেই সৌদি আরব থেকে বিপুল বিদেশী ঋণ প্রত্যাশা করে আছে। উপসাগরীয় অর্থও আসবে না ব্রিকসে, কারণ তারা ব্রিকসের সদস্য না। অর্থাৎ প্রস্তাবটি মোটেও আকর্ষণীয় নয়।’
তার পরও ব্রিকসের নেতা ও বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন সদস্যদের যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক জিডিপিতে ব্রিকসের হিস্যা ২৬ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশে উন্নীত হচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে হিস্যা ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানএকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওলা এল-শাওয়ারবি বলেছেন, ‘আমি জানি না এটা আসলে অর্থনৈতিকভাবে পটপরিবর্তনকারী হিসেবে পরিণত হবে কিনা। কিন্তু বাজার হিসেবে সেখানে আবেদন রয়েছে।’
বিদ্যমান ও নতুন সদস্যদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সংযুক্তি এক্ষেত্রে বিবেচ্য। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বাজার প্রধান ক্রিস টার্নার দাবি করেছেন, এমন ঘোষণার পেছনে ব্রিকসের আগের সদস্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। আইএনজির হিসাব অনুসারে, ২০১৫ সালের পর নতুন সদস্য হওয়া দেশগুলোতে ব্রিকসের পুরনো সদস্যদের রফতানি ২৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে ব্রিকস জায়গা দখল করে নিয়েছে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে।
অন্যান্য বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের দাবি, ব্রিকসের সম্প্রসারণে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে ইরান ও চীন। কারণ ইরান পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধের কারণে বিপর্যস্ত। অন্যদিকে পুরনো সদস্য চীন আগে থেকেই সম্প্রসারণের জন্য মরিয়া। কোপেনহেগেনভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকইনভেস্টের জ্যেষ্ঠ কমকর্তা জ্যাকব এখোল্ট ক্রিস্টানসন বলেছেন, ‘চীন, ব্রাজিল ও ভারত জ্বালানি তেলের মাধ্যমে বেশি লাভবান হবে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ও ইরান লাভবান হবে বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে।’ দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টেলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসনাইন মালিকের দাবি, সর্বোপরি ব্রিকসের সম্প্রসারণ তাদের জন্য সুবিধাজনক প্রমাণিত হবে, যারা পুঁজি তৈরির জন্য মরিয়া। আর্জেন্টিনা এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে। ব্রিকসের থেকে ঋণ গ্রহণ বেইলআউটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ডলারের আধিপত্য কমিয়ে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি করা ব্রিকসের অন্যতম লক্ষ্য। জোহানেসবার্গের সম্মেলনে সেটাও আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে। সদস্যদের দাবি ছিল, এর মাধ্যমে তারা তাদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারবে। জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী নতুন সদস্যদের সংযুক্তির বড় একটা কারণ হলো অর্থ তাদের ডলারবহির্ভূত মুদ্রায় জ্বালানি তেল সরবরাহে নিয়ে আসা। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি তেলের ব্যবসায়ই এ পরিবর্তনের ফল হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। যদি ডলারের বিপরীতে জ্বালানি তেলের ব্যবসায় অন্য কোনো মুদ্রা চলে আসে, সেটা সামান্য পরিমাণে হলেও বড় একটা ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে ব্রিকসের জন্য।










