বাংলদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান রেটিং ‘বি প্লাস’ বহাল রাখলেও ইস্যুয়ার ডিফল্ট (আইডিআর) রেটিংয়ের আউটলুক বা ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি ‘স্থিতিশীল’ থেকে কমিয়ে ‘নেতিবাচক’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংস। আজ বুধবার হংকং থেকে বাংলাদেশের রেটিং নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। সংস্থাটি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ধীরগতির সংস্কার এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসন বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
ফিচের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা ২০২৫ সালে জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য দেশের মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রাজস্ব আহরণকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বড় ধরনের কর অব্যাহতি, দুর্বল কর প্রশাসন এবং কম কর-অনুগত্যকে এর কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে।
রিজার্ভ নিয়ে ফিচ বলছে, ২০২৬ সালের মার্চে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে, যা প্রায় চার মাসের বৈদেশিক পরিশোধ ব্যয় মেটানোর সমান। এটি ‘বি’ ক্যাটাগরির দেশের মধ্যম মানের নিচে। ক্রলিং পেগ বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ধারাবাহিক অর্থায়ন রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়েছে। তবে চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি অব্যাহত থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মুদ্রা ও রিজার্ভ আবারও চাপে পড়তে পারে।
ফিচের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরেও উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে। মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে এলেও তা এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। ফিচ ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত তিনটি প্রধান কারণে রেটিং মান কমিয়ে দেয়া হতে পারে:
বৈদেশিক রিজার্ভের পতন: যদি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত কমতে থাকে, তবে তা বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেবে। বিশেষ করে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ কমে যাওয়া বা চলতি হিসাবের ঘাটতি লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়া রেটিং কমার প্রধান কারণ হতে পারে।
সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতা: সরকারের নীতিগত সংমিশ্রণ যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় এবং এর ফলে বৈদেশিক বাফার বা আপদকালীন তহবিল সংকুচিত হয়ে পড়ে, তবে সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
সরকারি ঋণের বোঝা: জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং সুদের ব্যয় মেটাতে গিয়ে যদি রাজস্বের বড় অংশ চলে যায়, তবে তা আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে। এছাড়াও রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা রেটিং অবনমনে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলে এবং নির্দিষ্ট কিছু সূচকে উন্নতি হলে রেটিং মান বৃদ্ধি পেতে পারে:
রিজার্ভ ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা: বিনিময় হার নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়লে যদি ফরেন রিজার্ভের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়, তবে রেটিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ পর্যায়ে উন্নীত করা হতে পারে।
কাঠামোগত সংস্কার: ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূরীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি কমাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা জরুরি। এটি মধ্যমেয়াদী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করবে।
রাজস্ব বৃদ্ধি: কর বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যদি কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়, যা সরাসরি সরকারি কোষাগারকে শক্তিশালী করবে এবং সুদের হারের বিপরীতে আয়ের অনুপাত উন্নত করবে, তবে তা ইতিবাচক রেটিং অর্জনে সহায়ক হবে।
তবে এসব ঝুঁকির মধ্যেও বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকায় ‘বি প্লাস’ রেটিং বহাল রাখা হয়েছে। ফিচ মনে করছে, বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে অব্যাহত সহায়তা দেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে।










