সম্প্রতি তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক চুক্তিটি এখন ‘কার্যকর নেই’। এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান গত কয়েক দিনে একে অন্যের ওপর একাধিক সামরিক হামলা চালিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের জলবায়ু সংকটকে আরো উসকে দিচ্ছে এ যুদ্ধ। খবর টাইম।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক সারাহ ইয়ারকিস ও আলেজান্দ্রো মার্টিন রদ্রিগেজ জানান, যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী প্রভাব ইরানসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা (মেনো) অঞ্চলের মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ অঞ্চলের তাপমাত্রা বিশ্বের গড় বৃদ্ধির চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে। এরই মধ্যে সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও মানবিক সংকটে জর্জরিত। এখন নতুন করে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সাসটেইনেবিলিটি, ক্লাইমেট অ্যান্ড জিওপলিটিকস কর্মসূচির ফেলো আলেজান্দ্রো মার্টিন রদ্রিগেজের মতে, যুদ্ধের সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউজ গ্যাস অঞ্চলটির জলবায়ুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৫০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়েছে পরিবেশে, যা বিশ্বের ৮৪টি দেশের সম্মিলিত বার্ষিক নিঃসরণের চেয়েও বেশি।

বাড়িঘর ও ভবন ধ্বংস, জ্বালানি মজুদে আগুন লাগা, যুদ্ধবিমানের জ্বালানি পোড়ানো এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যবহার বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরগুলো পুনর্নির্মাণের সময় আরো বড় অংকের কার্বন নিঃসরণ হবে।

সারাহ ইয়ারকিস বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে। এ অঞ্চলের অনেক দেশ মোট পানির চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মেটায় ‘ডেস্যালিনেশন প্লান্ট’-এর মাধ্যমে। এ পদ্ধতিতে সমুদ্রের পানি মিষ্টি করা হয়। কিন্তু চলমান যুদ্ধে পানির প্লান্টগুলোকে প্রধান সামরিক লক্ষ্যবস্তু করা হয়। গত মার্চে ইরানের হরমুজগান প্রদেশের কেশম দ্বীপে একটি ডেস্যালিনেশন প্লান্টে মার্কিন হামলার অভিযোগ ওঠে।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, হামলার কারণে ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর পরদিনই বাহরাইন অভিযোগ করে, ইরান তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানির প্লান্টে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রায় একই সময়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজিরাহ বিদ্যুৎ ও পানি প্লান্টেও হামলার ঘটনা ঘটে।

এছাড়া জুনের শুরুতে দক্ষিণ ইরানের জাস্ক ও সিরিক শহরে মার্কিন হামলায় দুটি পানির আধার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে হাজার হাজার মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে আগে থেকেই তীব্র খরা ও পানির সংকট ছিল, যা যুদ্ধের কারণে এখন এক চরম বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেসামরিক ও শিল্প অবকাঠামোয় নির্বিচারে হামলা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে তেল শোধনাগার ও রাসায়নিক প্লান্টে হামলার কারণে অঞ্চলটির সীমিত পানি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

তেহরানের শাহরান তেল ডিপো ও শহর-ই রে শোধনাগারে হামলার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেদ্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইসুস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে জানান, এ ধরনের হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্য, পানি ও বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা, যাদের মধ্যে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবেদন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকার যুদ্ধের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং পরিবেশ সুরক্ষার কাজ থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। পরিবেশের ক্ষতি সামাল দেয়ার জন্য যে অর্থ ও সক্ষমতা প্রয়োজন ছিল, তা এখন ব্যয় হচ্ছে সামরিক খাতে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন পর্যটন খাত থেকে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের রাজস্ব হারাচ্ছে অঞ্চলটি। ফলে দেশগুলোর সরকার চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে ও জলবায়ু সংকট বা পানির সমস্যা সমাধানের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করার মতো তহবিল তাদের কাছে নেই।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার বড় ধরনের মন্দা। ২০২২ সালের পর থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দাতা দেশের মধ্যে আটটি দেশই মানবিক সহায়তার তহবিল কমিয়ে দিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের শরণার্থী, সাধারণ কৃষক ও নারীদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে।

এদিকে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় আরো বাড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ইরানে আরো ৩২ লাখ ও লেবাননে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে গৃহহীন বা উদ্বাস্তু হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাতের দ্রুত টেকসই সমাধান না হলে, মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষকে প্রতিদিন বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করে যেতে হবে।