সপ্তাহের শেষ দিনে শেয়ারের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজার একটি নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং মাসজুড়েই লাভের ধারা বজায় রেখেছে। মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি এবং বিভিন্ন কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির খবরের ওপর ভর করেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনায় আগ্রহী হচ্ছেন। খবর রয়টার্স।

গতকাল বিশ্ব শেয়ারবাজারের সূচক দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচকও সমান হারে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো নেতিবাচক খবর না থাকায় বিনিয়োগকারীরা এখন বাজারের মৌলিক কাঠামোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী চক্র চলছে যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করছে।

তবে এ ইতিবাচক ধারার মধ্যেও প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি রয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিশাল অংকের বিনিয়োগ এবং এ প্রযুক্তির কারণে প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলে যে পরিবর্তন আসতে পারে তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফা করলেও গত বৃহস্পতিবার তাদের শেয়ারের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এনভিডিয়ার কাছ থেকে আরো বড় কোনো কিছু আশা করেছিলেন অথবা বর্তমান উচ্চ মূল্যে শেয়ারটি কিনতে তারা কিছুটা দ্বিধায় আছেন। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক ফিউচারও কিছুটা নিম্নমুখী ছিল।

অন্যদিকে বিশ্ববাজারের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরমাণু আলোচনার দিকে। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করায় নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চললেও এখনো বড় কোনো সমঝোতার খবর আসেনি। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, দুই পক্ষই নিজ নিজ রাজধানীতে আলোচনার পর পুনরায় বৈঠকে বসবে। কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকি কার্যকর হওয়ার ভয় রয়েছে, যা বড় ধরনের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

এ উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারেও। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) মূল্য ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৬৬ ডলার ৭৭ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭২ ডলার ২৪ সেন্টে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের বাজার এখন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতিতে চলছে। যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বাজারে এ অস্থিরতা বিরাজ করতে পারে।

মুদ্রা ও বন্ড বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। ডলার সূচক ৯৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে স্থির ছিল এবং ইউরোও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। জাপানি ইয়েনের বিনিময় হার ডলারের বিপরীতে কিছুটা কমেছে। জাপানে মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া এবং কারখানার উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সুদের হার বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব তাদের মুদ্রার ওপর খুব একটা পড়েনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লেবার পার্টির নির্বাচনী হারের পরও পাউন্ডের মান ১ ডলার ৩৪৮ সেন্টে স্থিতিশীল ছিল।

সামগ্রিকভাবে ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব পুঁজিবাজার একটি ভালো অবস্থানে থেকে শেষ হতে যাচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা কিছুটা চাপ তৈরি করলেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করে তুলছে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং এআই খাতের বিনিয়োগ কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাজারের পরবর্তী গতিপথ। এখনকার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই বিশ্ববাজারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।