চলতি বছরের গ্রীষ্মকালে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে ইউরোপের পর্যটন খাত। ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির সম্মুখীন হতে হচ্ছে ভ্রমণকারীদের, যা তাদের বাজেটকে প্রভাবিত করেছে। যদিও বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপের দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে পর্যটন খাত। পাশাপাশি এটি পরিষেবা খাতে মূল্যস্ফীতির উত্থানও ঘটিয়েছে। ফলে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিন্তিত, গ্রীষ্মকালীন পর্যটন খাতই ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে। খবর দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

ইউরোপের বৃহত্তম হোটেল চেইন অ্যাকরের গড় রুম ভাড়া ১৮ শতাংশ বেড়েছে। ট্যুর অপারেটর টুইয়ের বুকিংয়ে মূল্য বেড়েছে ৭ শতাংশ। গড় ফ্লাইট মূল্য ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার নির্ধারকরা জানান, পর্যটন খাতের প্রভাবে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির কারণে মূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা জটিল হতে পারে। মহামারীর জন্য ২০২০ সালে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যটন শিল্প আবারো প্রাক-মহামারী ফিরে আসায় ফ্লাইট, হোটেল রুম ছুটিতে ভ্রমণ ব্যয় দ্রুত বেড়েছে।

পর্যটন খাত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্বিক আয়ে প্রত্যক্ষভাবে ৪ শতাংশ ও পরোক্ষভাবে ১০ শতাংশ অবদান রাখে। পর্যটন খাত ইউরোপীয় অঞ্চলের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে চলতি বছর খাতটিতে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে মধ্যে দশমিক ৩ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে এটি পরিষেবা খাতে মূল্যস্ফীতি চাপ তৈরিতেও অবদান রাখছে, যা জুলাই পর্যন্ত চলতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ভোক্তা মূল্য বৃদ্ধির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক লক্ষ্যের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি। ইসিবি নির্বাহী বোর্ডের সদস্য ফ্যাবিও প্যানেটা জানান, পরিষেবা খাতে দামের বৃদ্ধির জন্য ছুটিতে ভ্রমণ ব্যয়কে চিহ্নিত করেছেন। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে পর্যটন খাতের প্রভাব পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এয়ারপোর্ট কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপের তথ্য থেকে জানা যায়, ইউরোপের বাইরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত দর্শনার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদেশ থেকে আসা যাত্রীরা স্থানীয়দের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি ব্যয় করছে। ইউরোপিয়ান ট্রাভেল কমিশনের এক জরিপে জানা যায়, ইউরোপীয় অঞ্চলের ৪১ শতাংশ ভ্রমণকারী চলতি বছর গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মাথাপিছু ১ হাজার ৫০০ ইউরোর বেশি ব্যয় করবে, যা গত বছর ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল ৩৩ শতাংশ। দাম বাড়লেও চাহিদা তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

ইতালির পর্যটনমন্ত্রী ড্যানিয়েলা সান্তানচে জানান, তাপপ্রবাহ ও বন্যার কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জুলাইয়ে ১ কোটি ৯০ লাখ দর্শনার্থী ইউরোপে আসবে। তাদের থেকে ১০ বিলিয়ন ইউরো পর্যটন আয় হবে আশা রাখছেন তিনি। গ্রিস চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫৭ লাখ ৬ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটককে স্বাগত জানিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। গ্রিক পর্যটন আয় মে মাসে ১৭৫ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোজোনের নতুন সদস্য দেশ ক্রোয়েশিয়া জুনে ২৭ লাখ বিদেশী পর্যটককে স্বাগত জানিয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ইতিবাচক এ প্রবণতা স্পেনেও দেখা গেছে। স্পেনের পর্যটনমন্ত্রী হেক্টর গোমেজ জানান, জুনে ৯১ লাখ পর্যটককে স্বাগত জানিয়ে তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কাজ করেছে। স্পেন গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে ১০ শতাংশ বেশি পর্যটক পেয়েছে।

পর্যটন খাতে ডাটা ইসিবির সুদহার বৃদ্ধিকে স্থগিত করার সিদ্ধান্তে উপনীত করতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মাসে ইঙ্গিত দিয়েছিল তারা ১৪ সেপ্টেম্বর তাদের পরবর্তী নীতিনির্ধারণী সভায় ধারাবাহিক সুদহার বৃদ্ধি বন্ধ করার বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। যদি পরিষেবা খাতে চলমান মূল্যস্ফীতি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারো সুদহার বাড়াতে পারে। জার্মান বেরেনবার্গ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার শ্মাইডিং জানান, সেপ্টেম্বরের নীতিনির্ধারণী সভায় যুক্তি দিতে হবে যে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ইসিবির সুদহার বাড়ানো উচিত হবে কিনা।