বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প বর্তমানে ব্যাপক সংকটের মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ডলার সংকট, বিনিময় হার বৃদ্ধি, ঋণপত্র খুলতে সমস্যা, চলতি মূলধন ঘাটতি, মাথাপিছু ব্যয় বৃদ্ধি, সংকুচিত গ্রাহক ঋণসীমা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা সমস্যায় বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে ঋণখেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় আছেন ইস্পাত শিল্প মালিকরা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি মূলধনের ৪০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ ঘাটতি পোষাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণকে ১২ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল ঢাকার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় তিনি সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি এ খাতের সংকট নিরসনের বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলো হলো ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি মূলধনের যে ৪০ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে, তা পরিশোধের জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণকে ১২ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা, বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এলসি সুবিধা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা, বিদ্যুতের নতুন দাম ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে মার্চ থেকে কার্যকর করা, ভারী শিল্প পর্যায়ে বাল্ক বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের শিল্প-কারখানা চলমান রাখার স্বার্থে গত ২৯ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনে এক্ষেত্রে বিদ্যুতের যে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে, তা বৃদ্ধি না করা, বিদ্যুতের ডিমান্ড চার্জের ক্ষেত্রে গত ২৯ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনে যে ন্যূনতম চার্জ বৃদ্ধি করা হয়েছে তা বৃদ্ধি না করা, ইস্পাত খাতের জন্য উৎসে কর কর্তন ২ শতাংশের পরিবর্তে দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা, ইস্পাতের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের জন্য আমদানি পর্যায়ে ন্যূনতম অগ্রিম আয়কর টনপ্রতি ৫০০ টাকার পরিবর্তে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিএম সনদ ফি বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বাতিল করা এবং সিএম সনদ ফি টার্নওভারের ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে নির্দিষ্ট করে দেয়া।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘স্টিল শিল্প মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসা বন্ধ করার উপক্রম হয়েছে, যার ফলে চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যাংক ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্টিল শিল্প রক্ষার লক্ষ্যে অবিলম্বে এ খাতকে সুরক্ষা দেয়া অতীব জরুরি।’ সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎসংক্রান্ত বিষয়গুলো বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে ও শিল্পসংক্রান্ত বিষয়গুলো শিল্পমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফল পাইনি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইস্পাত উৎপাদনে খরচ বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। আর গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে প্রতি টনে ৩ হাজার টাকা বেড়েছে। ব্যাংকে আমাদের মোট ঋণসীমা একই অবস্থানে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা ১০০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মানোয়ার হোসেন বলেন, ‘মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। চাহিদা কম। ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারছি না। টাকার সরবরাহও কমে গেছে। সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। প্রায়োরিটি বেজড প্রকল্প নিতে হবে। আমাদের সবার পুঁজি কমে গেছে, এটা বাস্তবতা। এখন সময় এসেছে এটার সমাধান বের করার।’
তিনি বলেন, ‘পুরো বাংলাদেশই সমস্যায় জর্জরিত। গুড গভর্ন্যান্স এবং নিয়তের সমস্যার কারণে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। বিনা প্রশ্নে দেশের বাইরে থাকা ধনাঢ্যদের থেকে ডলারের একটা প্রবাহ আনা যেতে পারে।’
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, ‘আমরা প্রণোদনা চাই না, পুঁজি চাই। দাম বাড়ার পরও গ্যাস পাচ্ছি না। স্ক্র্যাপ ও স্টিলের দাম সারা বিশ্বে ওঠানামা করে। সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে অপচয় রোধ করতে পারে। আমাদের ১৭-১৮টা লাইসেন্স নিতে হয়। সেখানে অনেক অর্থ খরচ হয়।’
সংগঠনের অন্য নেতারা বলেন, ইস্পাত খাত রক্ষায় সরকারের সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। আর এ খাত অস্তিত্ব সংকটে পড়লে দেশের আবাসনসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হুমকিতে পড়তে পারে। সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল সুমন চৌধুরী, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ শহিদউল্লাহ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মারুফ মহসিন ও আব্দুস সালাম উপস্থিত ছিলেন।










