সুদহার বাড়ানোর নীতি থেকে বের হয়ে আসছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টানা ১৪ মাসে ১০ বার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এলেও থামতে যাচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। তবে আগামী বছরের জুলাইয়ের আগে কমানোর সিদ্ধান্ত আসবে না। সম্প্রতি এমনটাই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে রয়টার্সের চালানো জরিপে।

৮৫ জন অর্থনীতিবিদ নিয়ে ১২-১৯ অক্টোবরে জরিপ পরিচালনা করে রয়টার্স। বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অংশগ্রহণকারীদের কেউ সুদহার বাড়ানোর পক্ষে মত দেয়নি। তবে কখন থেকে কমানো হবে, সে বিষয়ে দ্বিধা কাটেনি নীতিনির্ধারকদের।

জরিপে অংশ নেয়া ৫৮ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আগামী বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কমানো শুরু হবে সুদহার। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ডিপোজিট রেট দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। ৭০ জনের মধ্যে ২৯ জন পূর্বাভাস দিয়েছেন, আগামী বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কমানো হতে পারে। আগামী জুলাইয়ে ইসিবি প্রধান ক্রিস্টিনা লেগার্দে ও নীতিনির্ধারণী পরিষদের সদস্যদের সভা হবে। তখন সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষিত হতে পারে বলে মনে করেন ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।

ডেকাব্যাংকের প্রধান ক্রিস্টান টোয়েডম্যান বলেন, ‘‌আমাদের মডেল অনুসারে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত আরো আগেও আসতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আরো অনেক কিছুই বিচার করতে হবে। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ বিচার হতে পারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর।’

এর আগে রয়টার্সের জরিপেই অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশের পূর্বাভাস ছিল আগামী বছরের মাঝামাঝি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে ২৫ জন অর্থনীতিবিদ মনে করেন, পূর্বাভাস করাটা কঠিন। আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জ্যাক এলনে রে বলেন, ‘‌সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার চেয়েও দুর্বল। কিন্তু এটা উচ্চ সুদহার নীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলবে না।’

ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বরে কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এটা এখনো ইসিবির লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণ। ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফ্রানসোয়া ভিলেরয় গত সপ্তাহে বলেন, ‘‌ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত সুদহার বর্তমান পর্যায়ে রাখা।’

মূল্যস্ফীতির নিম্নগতি অব্যাহত থাকবে। কিন্তু জরিপে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের আগে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছবে না। চলতি বছরে মূল্যস্ফীতি থাকবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আগামী বছরে কমে ২ দশমিক ৭ শতাংশে আসবে এবং ২০২৫  সালের মধ্যে কমে ২ দশমিক ১ শতাংশে নামবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে। তৈরি হয়েছে আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা। ইউরোজোনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জীবনযাপনের ব্যয় বেড়েছে অপ্রত্যাশিতভাবে। প্যান্থিয়ন ম্যাক্রো-ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেলেইনে ডেবোনো বলেন, ‘‌মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে শ্লথগতি পার করছে ইউরোজোনের অর্থনীতি।’

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানি। গত প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। চলতি প্রান্তিকেই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তৈরি হয়েছে মন্দার ঝুঁকি। অবশ্য ফ্রান্সের অর্থনীতি তুলনামূলক ভালো থাকলেও তা প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। ইউরোজোনের জন্য বছরের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থনৈতিক সংকোচন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমে এরই মধ্যে সংকোচন দৃশ্যমান। গত কয়েক বছর টানা সুদহার বাড়ার ঘটনা ঋণ গ্রহণকে আরো কঠিন করে তুলেছে।