লম্বা সময় ধরে নাকে লেগে থাকা রুটি ও মাখনের ঘ্রাণ, কেবলই ভেজে তোলা টাটকা সমুচা ও আগুন গরম ক্রিমি ইরানি চা—এসবই ভারতে অবস্থিত পারস্য ধাঁচের রেস্তোরাঁগুলোর প্রধান আকর্ষণ। ইরানি ক্যাফে নামে পরিচিত আইকনিক রেস্তোরাঁগুলোর রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য। তবে ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানগুলো ভারতে আর কতদিন টিকে থাকবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠেও এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্বেল পাথরের টেবিল, দেয়ালে পুরনো ধাঁচের ঘড়ি, ছককাটা মেঝে ও স্বতন্ত্র খাদ্যতালিকা নিয়ে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে এসব ইরানি ক্যাফে। ভারত ছাড়িয়ে বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছে ইরানি ক্যাফেগুলোর প্রভাব। যেমন লন্ডনের অন্যতম জনপ্রিয় চেইন রেস্তোরাঁ ডিশুমের অনুপ্রেরণাও এ দোকানগুলো।
আঠারো ও উনিশ শতকে মুম্বাই ও পুনের মতো শহরে পারস্যের অভিবাসীরা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ক্যাফে চালু করেন। পরে দক্ষিণের শহর হায়দরাবাদে স্থানীয় সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত অংশ হয়ে ওঠে এ ক্যাফে।
বর্তমানে মুম্বাইয়ের পরে হায়দরাবাদেই সবচেয়ে বেশি ইরানি ক্যাফে আছে। পুনেসহ এ দুই শহরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ফাস্ট ফুড কালচার ও ভোক্তা রুচির পরিবর্তনে ক্যাফের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে বলে জানান মালিকরা।
ইরানিরা যে সময়ে ভারতে এসেছিল তা উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে মিলে যায়। ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে পানীয় হিসেবে চায়ের প্রচলন ঘটায়। আর ইরানিরা চায়ে নিয়ে আসে নিজস্ব ঢং। ক্রিম ও কনডেন্সড মিল্কের সঙ্গে তৈরি হয় নতুন রসায়ন।
হায়দরাবাদভিত্তিক ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ সফিউল্লাহ বলেন, ‘প্রথমে চা খানা নামে পরিচিত ছিল এসব ক্যাফে এবং শুধু মুসলমানরা আসত। কিন্তু শিগগিরই অন্যান্য ধর্মের মানুষও এর স্বতন্ত্র স্বাদের ভক্ত হয়ে ওঠে।’
গত শতকে ইরানি ক্যাফেগুলো পৌঁছে যায় হায়দরাবাদের প্রতিটি কোণে। এক কাপ চা হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত মানুষ। অল্পকিছু অর্থের বিনিময়ে পছন্দের গান শোনার ব্যবস্থাও ছিল। ইতিহাসবিদ পারভাস্তু লোকেশ্বর বলেন, ‘হায়দরাবাদের ইরানি ক্যাফেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ক্যাফেগুলোর নামের কোনো ধর্মীয় অর্থ ছিল না। সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল।’
তবে এখন ক্রমেই কমে আসছে ক্যাফের সংখ্যা। বিখ্যাত দ্য গ্র্যান্ড হোটেলের মালিক জলিল ফারুক রুজ বলেন, ‘দুই দশক আগেও হায়দরাবাদে ইরানি ক্যাফে ছিল ৪৫০-এর বেশি। এখন অবশিষ্ট আছে ১২৫টি। একসময় দিনে আট-নয় হাজার কাপ চা বানানো হলেও এখন নেমে এসেছে চার হাজার কাপে।’
বিক্রি কমে আসার কারণ হিসেবে হায়দরাবাদের বিবর্তনকে দেখিয়েছেন এ রেস্তোরাঁ মালিক। প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির ফলে নব্বইয়ের দশকে হায়দরাবাদের চেহারার সঙ্গে এখনকার অবস্থার একদমই মিল নেই। ভারতের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও ফাস্ট ফুড চেইন জায়গা করে নিয়েছে। যেখানে বসার জায়গা থেকে শুরু করে খাবারের তালিকায় এসেছে বৈচিত্র্য।
জলিল ফারুক রুজ জানান, অধিকাংশ ইরানি ক্যাফের জন্য প্রশস্ত জায়গা দরকার আর জায়গা ভাড়া নিয়েই ব্যবসা করে আসছেন তারা। কিন্তু বিক্রি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ভাড়ার পরিমাণ। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় গুঁড়া দুধ ও চা পাতার দাম পাঁচ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে তিন গুণ।
তাই অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে অন্য কিছুতে মনোযোগ দিচ্ছেন। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কয়েকজন ব্যবসায়ী স্রোতের প্রতিকূলে ক্যাফে চালিয়ে যাচ্ছেন। তেমনই একজন রেড রোজ রেস্তোরাঁর মালিক সৈয়দ মোহাম্মদ রাজাক। তার দাদা তেহরান থেকে এসে ১৯৭০ সালে সিটি লাইট হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে রাজাকের বাবা চালু করেন রেড রোজ রেস্টুরেন্ট।
পেশায় প্রকৌশলী ও গ্রাফিক ডিজাইনার রাজাক স্বীকার করেছেন, শুধু চা ও বিস্কুট বিক্রি করা সহজ বা লাভজনক কোনোটিই নয়। তাই গ্রাহক আকৃষ্ট করতে মেনুতে এনেছেন বৈচিত্র্য। ব্যবসা সম্প্রসারণ ও অনলাইনে প্রচারের জন্য তিনি ব্যবহার করছেন গ্রাফিক ডিজাইনিং দক্ষতা। সঙ্গে জানান, পারিবারিক উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখতে চান তিনি।
গ্রাহকের অনেকেই পারিবারিকভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ক্যাফের ভোক্তা। তেমন একজন ইয়ানি। তিনি বলেন, ‘ইরানি চা আমার জীবনের অংশ। বাইরে গেলেই এ চা পান করি।’










